সায়াৎ নোভা অথবা রক্তবীজের রং

ছায়াছবি-কথা – ১১

আগের পর্বে

পরিবর্তন আর পরিবর্তনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের দিকে এক অনিবার্য যাত্রা। এমনটাই যেন ফুটে ওঠে অচল মিশ্র পরিচালিত মৈথিলী ভাষার ছবি ‘গমক ঘর’-এ (২০১৯)। সিনেমায় উঠে এসেছে বিহারের দ্বারভাঙা জেলার মধুপুরা গ্রামের একটি পরিবারের বাড়ি। ১৯৯৮, ২০১০, ২০১৯ ছবিতে তিনটি পৃথক সময়কে তিনটি আলাদা আলাদা ফ্রেমের অনুপাতে ধরেছে আনন্দ বনসলের ক্যামেরা। যার মধ্যে ফুটে উঠেছে এগিয়ে চলা। আর সেই বাড়িটাই হয়ে উঠেছে যেন জীবন্ত এক জাদুঘর।
 

রাজার বোনের প্রেমে পড়ে খোয়াতে হয়েছিল রাজদরবারে গায়কের চাকরি। তারপর চার্চের পুরোহিত। আঠেরো শতকের গোড়ার দিকে জর্জিয়ায় জন্মগ্রহণ করা আর্মেনিয়ান ত্রুবাদুর সায়াৎ নোভা ছিলেন একজন কবি, সঙ্গীতকার এবং আশিক। আজারবাইজানি তুর্ক ভাষায় আশিক সেই, যে পুরাণকথা বা স্বরচিত পদ গাইতে গাইতে নিজেই বালামা বাজিয়ে সঙ্গত করে। সায়াৎ নোভা শব্দের অর্থ ‘সঙ্গীতের ঈশ্বর’। এ হেন ঈশ্বরকে খুন হতে হয়েছিল ১৭৯৫ সালে।

সঙ্গীতের সেই ঈশ্বরকে নিয়ে ছবি করেছিলেন, চলচ্চিত্রশিল্পের জগতে ভয়ানক বিতর্কিত চরিত্র, সের্গেই পারাজানোভ।সোভিয়েতের চলচ্চিত্র-বিদ্যালয় ভিজিআইকে-র ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও নান্দনিকতার দিক থেকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদকে (সোশ্যালিস্ট রিয়লিজম) তিনি কখনোই গ্রহণ করেননি। তার কাজের ওপর বারবার নিষেধাজ্ঞা চেপেছে সোভিয়েত রাশিয়ায়। জেলেও কাটাতে হয়েছে বেশ কিছু বছর। ছবির ওপর নানারকম কাটাছেঁড়া করার পর ছবির নাম সায়াৎ নোভা-র পরিবর্তে করতে হয়েছিল দ্য কালর অফ পোমাগ্রনেটস (১৯৬৯)। আর্মেনিয়ায় ছবিটার যে সংস্করণ প্রদর্শিত হয়েছিল, তা ছিল ৭৮ মিনিটের। আর রাশিয়ার সংস্করণের দৈর্ঘ ছিল ৭৩ মিনিট। বাদ দেওয়া হয়েছিল কিছু ধর্মীয় আচারের দৃশ্য আর সায়াতের নাম যেখানে যেখানে ইন্টরটাইটলে ছিল, সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছিল, যেহেতু কর্তৃপক্ষের মনে হয়েছিল ছবিটা আদৌ সর্বার্থে সায়াতের জীবনানুগভাবে তথ্যজ্ঞাপক হয়নি।

এক্কেবারে নিজের মতো শৈল্পিক ব্যাখ্যা করে, কাব্যময়তার সঙ্গে, এই ছবি বানিয়েছিলেন পারাজানোভ। ত্রুবাদুর কবি সায়াতের জীবনকে সাতটা পর্বে ভেঙে নিয়েছিলেন তিনি। তারপর প্রত্যেকটা পর্বের মঞ্চায়ন। অভিনেতারা মুকাভিয়ন করছেন ক্যামেরার সামনে, ফ্রেমের মাপ (ম্যাগনিফিকেশন) অনুযায়ী পুর্বনির্দিষ্ট একটা জায়গায়। আর আছে অল্প কিছু পুরনো হাতে আঁকা ছবি আর ইন্টরটাইটল। আর ‘অশ্রুতপূর্ব’ একটা চলচ্চিত্রোপযোগী সঙ্গীতপট, যার সঙ্গে রয়েছে ফ্রেমের বাইরে থেকে ভেসে আসা সামান্য কিছু সংলাপ। চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে এটাই ছিল তিগরঁ মাঁশুরিয়ঁ-র প্রথম কাজ, যেখানে তিনি বহু ‘লোক’সাঙ্গীতিক চিহ্নক ব্যবহার করেছিলেন।

 

আরও পড়ুন
গমক ঘর

এই ছবিতে সমস্তটা ঘটছে ট্যাবলো ভিভাঁ-র ঢঙে। সামান্য দু’একবার অল্প প্যান বা টিল্ট বাদ দিয়ে, ট্যাবলোর স্বাভাবিকতা বজায় রেখে, ক্যামেরা একেবারেই স্থির। প্রায় থিয়েটরের আলোয়, থিয়েটরের মতো ক’রে হচ্ছে সবকিছু, কখনো ঘরের ভেতর কখনো বাইরে। চরিত্রদের ছায়া পড়ছে ভীষণ নরমভাবে। এখানে ক্যামেরা যেন মূলত সর্বত্রগামী (ইউবিক্যুটাস) নয়। ফ্রেমে প্রতীকী সাজসরঞ্জাম, কিছু শূন্যে ভাসমান অবস্থায় দোলে বা নড়াচড়া করে নির্দিষ্ট ছন্দে; হয়ত বালামা, হয়ত কিউপিড। অভিনেতারা নানা কাজ অথবা নানা শরীরী বিভঙ্গ করছেন মূলত ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। অভিনেত্রী সাফিকো ছ’টি পুরুষ ও নারী চরিত্রে অভিনয় করেন এ ছবিতে। ফলস্বরূপ, লিঙ্গনির্ধারিত অভিনয়রীতিকেও অগ্রাহ্য করা হয় কাব্যময় এই ছবিতে। অথবা নির্মিত হয় উভলৈঙ্গিক অভিনয়কলা কিম্বা লিঙ্গনিরপেক্ষ পোশাক‘রীতি’। সমস্ত কিছুকেই এখানে সামনে থেকে সরাসরি দেখা হচ্ছে (ফ্রন্টালি)। বর্ণের নাট্যাভিনয় অনুষ্ঠিত হয় সাদা, কালো আর লাল রঙের মূলত পোষাকের ব্যবহারে; অথচ মলিন, বিবর্ণ প্রচ্ছদপটও থাকে অনায়াসে। মধ্যযুগের অনুচিত্র (মিনিয়েচার পেইন্টিং) অনুসারী মনে হয় এই ছবির সজ্জাকে। আর্মেনিয়ান স্থাপত্য, ‘লোক’আচার, কাঁথাশিল্প, চিত্রকলা, ‘লোক’শিল্পের মিশেলে এই সজ্জা নির্মিত। বালক সায়াতের মানসপটের নির্মাণ আর তাঁর পরবর্তী জীবন উদ্ভাসিত হতে থাকে এসবের কাব্যিক প্রতিচিত্রায়ণের মধ্যে দিয়ে। এই ছবিতে থাকা নানা রং, আকৃতি ইত্যাদিকে অনেকে পারাজানোভের জাতীয়তাবাদী অভিব্যক্তি হিসেবে পড়েছেন।

আরও পড়ুন
স্বপ্নোন্মাদের মৃত্যু

 

আরও পড়ুন
মধুর রাজ্য

“আমি সেই, যার জীবন ও আত্মা যন্ত্রণাদীর্ণ”-- বাক্যবন্ধ দিয়ে এই ছবি শুরু হয়। আর সেই যন্ত্রণাময় দীর্ণ আত্মাই জড়িয়ে থাকে ছবিটাকে। সায়াতের গানের খাতার (দাভতর) ছবি দেখা যায়। ছবির শুরুতেই ডালিমের রঙ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে ফ্রেমের সাদা জমিতে তা প্রায় রক্তধারার মতো লাগে। পায়ের চাপে আঙুরের দানা থ্যাঁতলানো অথবা অজস্র গ্রন্থ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলধারা শুরু থেকেই একটা অস্বস্তি তৈরি করে। তবে তাকে প্রথাগত অর্থে হিংস্র (ভায়োলেন্ট) বলা যায় না একেবারেই, যদিও এখানে বন্দুকের মোটিফ ফিরেফিরে আসে। পশুবলির দৃশ্য ছাড়া আর কোথাও তেমন হিংস্রতার আঁচ পাওয়া না গেলেও, স্বস্তিদায়ক তেমন আবহ তৈরি হয় না কখনোই। মেটাফর নয়, অ্যালেগোরি অর্থে রূপকধর্মী বলা চলে এর আখ্যান শরীরকে। মানুষদের যেমন ‘সাধারণ’ ছন্দে দেখা যায় না এখানে, তেমনই এমনকি ঘোড়ার চলার স্বাভাবিক ছন্দকেও ভাঙা হয় এখানে; যে ছন্দকে নকল করতে গিয়ে বালক সায়াত আর এক ভিন্ন ছন্দে পৌঁছোয়। তাল-ছন্দ-লয় দিয়ে তৈরি একটা ছবি এমন একটা ছন্দে গিয়ে পৌঁছোয় যাকে ‘আর্ট ন্যুভো’ দিয়ে হয়ত কিছু মাত্রায় পড়া যায়, যেখানে চারুশিল্প আর কারুশিল্পের ভিন্ন খোপ ভেঙে পড়ে মিলেমিশে যায় একে অপরের দেহে। এখানে প্রত্যেকটা শট যেন এক একটা চিত্রপট অথবা ছবি আঁকার মুক্ত ক্যানভাস। যেন ক্যানভাসের মানুষী মুর্তিগুলো, পশুপাখির মূর্তিগুলো হঠাৎ কোনও যাদুকাঠির ছোঁয়ায় প্রাণ পেয়ে জেগে উঠে বিভিন্ন মুদ্রা আঁকতে থাকে ফ্রেমের পট জুড়ে। একটার পর একটা স্বপ্নদৃশ্য যেন সরে সরে যায়। “হে নিঃস্পন্দ, জীবনের জঙ্গমতা তোমাদের চারপাশে একটা গুটির বলয় তৈরী করে যাতে পরবর্তী জন্মে তোমরা প্রজাপতি হতে পারো।” স্থাপত্যের নকশা আর নকশার স্থাপত্য এখানে এমনভাবে পাশাপাশি স্থান ক’রে নেয়, যেখানে রেশম আর কংক্রিট তাদের স্ব বিসর্জন দিয়ে সমর্পিত হয় পটচিত্রের জমিতে। ‘পৃথিবীটা একটা জানলা’ হয়ে ধরা দেয় এই ছবিতে, বিমূর্ত-মূর্ততায় এক ‘অনন্য’ চিত্রভাষ হয়ে। ‘অনন্যের’ মতো অনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করতেই হচ্ছে যেহেতু এ ছবির প্রতিটি শটের বা দৃশ্যের নির্দিষ্ট অর্থ প’ড়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। আবার অনির্দিষ্টতা পারাজানোভ নিজেও ব্যবহার করেছেন, যেহেতু সায়াতের জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তের পুঙ্খানুপুঙ্খতা সাজাতে কল্পনার আশ্রয় নিতেই হিয়েছে তাঁকে।

আরও পড়ুন
ক্যামেরার মৃত্যু, ছবির জন্ম

 

আরও পড়ুন
নৈঃশব্দ্যের বৈধব্য

১৯৫৪ থেকে ছবি তৈরি শুরু করলেও সে সমস্ত ছবি তাঁর নিজের মতে ছিল-- “গার্বেজ”, আবর্জনা। আঁদ্রে তারকোভস্কির ইভানস্‌ চায়ল্ডহুড দেখার পর তিনি ভয়ানক উজ্জীবিত হয়েছিলেন। ইতালীয় চলচ্চিত্র পরিচালক পিয়ের পাওলো পাসোলিনির কাজের দ্বারাও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন পারাজানোভ। ১৯৬৫-তে যে ‘শ্যাডোজ অফ ফরগটন অ্যানসেস্টারস’ (বিস্মৃত পূর্বজদের ছায়ারা) বানিয়েছিলেন, নির্মাণপ্রক্রিয়াগত দিক থেকে তা কিন্তু এই ছবির থেকে একেবারেই আলাদা ঘরানার। সেই ছবিই যদিও তাকে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। বরং বলা যায় ১৯৮৫-র দ্য লেজন্ড অফ সুরাম ফোর্ট্রেস (সুরাম কেল্লার কিংবদন্তি)-এর সঙ্গে এই ছবির আঙ্গিকগত মিল বেশি। যদিও সে ছবিতে প্রকৃতির অবস্থান অনেক ব্যাপ্তি নিয়ে হাজির হয়। সঙ্গীতযন্ত্র বালামা ছাড়াও, ডালিমের মোটিফ এমনকি তাঁর নির্মিত আশিক করিব (১৯৮৮) ছবিতেও ফিরেফিরে আসে। সে ছবিতে ডালিম এমনকি সাদা রং পর্যন্ত ধারণ করে, আবার সুরাম ফোর্ট্রেস-এ “ডালিমের রস চোখ পুড়িয়ে দিয়েছে”-- শোনা যায় এমনও। আসলে আর্মিনিয়ার ধর্ম-সংস্কৃতিতে (আজারবাইজানেও) ডালিম খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান, যা জন্ম-জীবন-বিবাহের অনুষঙ্গে জড়িয়েজাপ্টে থাকে সবসময়। স্বভাবতই সায়াতের যাপন-আখ্যানে ডালিমের উপস্থিতির নিহিতার্থ এই সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের নির্দিষ্টতা-নিরপেক্ষভাবে বোঝা দুষ্কর।

আরও পড়ুন
ঈব আল্ল ঊউ

রাজদরবারে রোম্যান্টিক গান বাঁধতেন সায়াৎ। জর্জিয়ান, আর্মেনিয়ান, আজারবাইজিনিয়ান-- তিনটে ভাষার শব্দই তাঁর রচনায় ব্যবহার করতেন তিনি। (পরবর্তীতে জর্জিয়া আর্মেনিয়া আজারবাইজান-- এই প্রত্যেকটা জায়গাই সোভিয়েত রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি নিয়ে।)

“Lo, I am drunken with thy love! I wake, but my heart sleeps.
The world is sated with the world; my heart its hunger keeps.
What shall I praise thee by, when naught is left on earth, save thee?
 Thou art a deer, a Pegasus sprung from the fiery sea!”-- এই উচ্চারণের স্রষ্টাকে যেভাবে চলচ্চিত্র মাধ্যমে ধরেছিলেন পারাজানোভ, তাকে একমাত্র পুরাণকথা কি কিংবদন্তির অভিনয় দেখার অভিজ্ঞতা বলা যায় হয়ত, যেখানে কাব্য অনূদিত হয় চলচ্চিত্রে।

Powered by Froala Editor