আত্মহত্যার চিন্তা সরিয়ে অন্যদেরও বাঁচার মন্ত্র দিচ্ছেন মনীষা

‘কাউকে কোনোদিন বোঝাতে পারতাম না যে আমি কতটা যন্ত্রণার মধ্যে আছি। প্রত্যেকে বিদ্রুপ করত। কেউ কেউ বলত আমি নিজেই অবিবেচক। আমি জানি না পৃথিবীতে কত মানুষ খাবারের জন্য লড়াই করছেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই মনে হত আমার শরীরটা রক্তে ভাসতে দেখলে নিশ্চই প্রত্যেকে বুঝবে, হ্যাঁ আমিও যন্ত্রণার মধ্যে ছিলাম।’ বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে (World Suicide Prevention Day) প্রহরকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মনীষা গঙ্গাশ্রী।

তামিলনাড়ুর রাজাপলাইয়াম শহরের বাসিন্দা মনীষা। স্নাতক স্তরে পড়াশোনার সময় থেকেই একাধিক মানসিক সমস্যায় জর্জরিত তিনি। এর মধ্যে পরিচিত কয়েকজনের কাছে যৌন হেনস্থারও শিকার হন। আর এই সবকিছু মিলিয়েই যখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছেন, সাহায্যের জন্য পাশে পাননি কাউকেই। তবে সেইসব দিন পেরিয়ে আজ জীবনের মূল স্রোতে ফিরে আসতে পেরেছেন মনীষা। ‘হিয়ার মি’ (HearMe.app) মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের ইন্টার্ন মনীষা এখন তাঁর মতোই আরও অনেক মানুষকে বেঁচে থাকার দিশা দেখাচ্ছেন। মন দিয়ে শোনেন প্রত্যেকের যন্ত্রণার কথা। মনীষার কথায়, “নিজের যন্ত্রণার কথাটুকু অন্য কাউকে বলতে পারলেই অনেকটা হালকা লাগে। তবে সেই মানুষটা যদি যন্ত্রণাটা বুঝতে পারেন, তাহলেই।” ‘হিয়ার মি’ অ্যাপ্লিকেশনের পাশাপাশি ‘দ্য রেডডোর ফাউন্ডেশন’-এর একজন নির্বাচিত ফেলো মনীষা। সেইসঙ্গে নিজের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলের মাধ্যমেও বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে চলেছেন তিনি।

প্রায় ৫ বছর ধরে আত্মহত্যার প্রবণতা কাজ করত মনীষার মধ্যে। কিন্তু তখনও তিনি বেঁচে থাকতে ভালোবাসতেন, বেঁচে থাকতে চাইতেন। মনীষা বলছিলেন, একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে প্রত্যেকেই কিন্তু বেঁচে থাকতে চায়। আর তিনি নিজের এই সাহায্য পেয়েছিলেন ‘দ্য ওয়াল অ্যান্ড আস’ নামের একটি এনজিও থেকে। ২০১৯ সালে ইন্টারনেটে সংস্থাটির কথা জানতে পারেন মনীষা। তারপরেই যোগাযোগ করেন সেখানে। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা আদিত্য সরকার নিজেও একসময় আত্মহত্যার প্রবণতায় ভুগতেন। সেই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার পরেই তাঁর মনে হয়, এই লড়াই একা জেতা সম্ভব নয়। তাই আত্মহত্যার প্রবণতায় ভুগতে থাকা সমস্ত মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে তৈরি করেছিলেন ‘দ্য ওয়াল অ্যান্ড আস’। মনীষা বলেন, “আজও এই এনজিওর সঙ্গে যুক্ত আছি বলেই আমি জীবনে বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে পাচ্ছি। এখন আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিলেও বাকিদের সঙ্গে কথা বলে, তাঁদের সাহায্য নিয়ে আবারও জীবনে ফিরতে পারি।”

আসলে আত্মহত্যার প্রবণতাকে এখনও আমাদের দেশে খানিকটা বাঁকা চোখেই দেখা হয়। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার অভাব সর্বত্র। অনেকে মনে করেন এই প্রবণতা বুঝি বিশেষ কিছু বর্গের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু মনীষা বলছিলেন, “হিয়ার মি’-র লার্নিং ইন্টার্ন হিসাবে এবং ‘দ্য রেডডোর ফেলোশিপ প্রোগ্রাম’-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে আমি দেখেছি সমাজের প্রতিটা স্তরেই এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। একে কোনো অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে বা কোনো লিঙ্গপরিচয় দিয়ে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। মানুষ বিশ্বাস করতে ভুলে গিয়েছে যে এই পৃথিবীতে সে একা নয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা এই বার্তাটাই সবাইকে দেওয়ার চেষ্টা করছি, এই পৃথিবীতে কেউ একা নয়। কোনো যন্ত্রণাও কারোর একার যন্ত্রণা নয়। আজ আমি যে যন্ত্রণা অনুভব করছি, আমার আগে অন্য কেউ সেই একই যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। আমার পর আবার অন্য কেউ যাবেন। আমরা চেষ্টা করলেই একজন আরেকজনের যন্ত্রণার শরিক হতে পারব।”

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো সহ অন্যান্য নানা সংস্থার রিপোর্ট আমাদের প্রতি বছর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সমাজে আত্মহত্যার প্রবণতা কতটা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। আর আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে যায় তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি মানুষের। তাঁদের প্রত্যেকের জন্যই বছরে এই একটি দিন উৎসর্গ করা হয় বিশ্বজুড়ে। আর এই দিনটার সবচেয়ে বড়ো গুরুত্ব একজন মানুষের সঙ্গে অন্য একজন মানুষের যোগাযোগের সেতু তৈরি করে দেওয়া – এমনটাই মনে করছেন মনীষা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মনীষার কথাটাই মন্ত্র হয়ে উঠুক, ‘এই পৃথিবীতে কেউ একা নয়’। প্রত্যেকে একসঙ্গে মিলেই পৃথিবীটা সুন্দর করে তোলা যায়।

Powered by Froala Editor

More From Author See More

Latest News See More