গোটা আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এই রহস্যময় পাথরফলক, কোন বার্তা লুকিয়ে এতে?

রাস্তার ওপরেই বসানো ছোট্ট একটি পাথর ফলক। আয়তন হুবহু গাড়ির নম্বর প্লেটের মতো। সাদা রঙের সেই পাথরের গায়ে লাল ভাঙা ভাঙা হরফে লেখা ‘টোয়েনবি আইডিয়া/ ইন কিউব্রিকস ২০০১/ রেসারেক্ট ডেড অন প্ল্যানেট জুপিটার’। 

নিউ ইয়র্ক থেকে শুরু করে ডেট্রয়েট, ইন্ডিয়ানাপলিস, পিটসবার্গ, টলেডো, আটলান্টিক সিটি, ওয়াশিংটন ডিসি, সেন্ট লুইস, বস্টন, কানসাস সিটি— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০টিরও বেশি প্রধান প্রধান শহরে গেলেই দেখা মিলবে এই আশ্চর্য প্রস্তরফলকের (Memorial Tiles)। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, মেক্সিকো, কানাডা এবং লাতিন আমেরিকান দেশ চিলি, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় দেখা মেলে এই আশ্চর্য স্মারকের। কিন্তু এই পাথরে লেখা কথাগুলির অর্থ কী? কে-ই বা স্থাপন করেছে 'টোয়েনবি টাইলস'-খ্যাত (Toynbee Tiles) এই পাথরগুলি? 

না, সে ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট তথ্যই বর্ণিত নেই এই পাথর ফলকে। নব্বই-এর দশকের শুরুর দিক সেটা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, বিশ্বের একাধিক আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকায় জায়গা করে নেয় এই পাথরগুলি। চর্চা শুরু হয় বিশ্বজুড়ে। তবে তারও প্রায় এক দশক আগেই মানুষের চোখে ধরা দিয়েছিল এইসকল আশ্চর্য পাথরফলকগুলি। আশির দশকে বহু মার্কিন ফটোগ্রাফার ক্যামেরাবন্দি করেন এই দৃশ্য। 

সে যাই হোক না কেন, নব্বইয়ের দশক থেকেই এই পাথরগুলোর রহস্যোন্মোচন করতে দফায় দফায় তদন্তে নামেন কনস্পিরেসি থিওরিস্টরা। কেউ বলেছিলেন ২০০১ সালেই ধ্বংস হবে বিশ্ব। আর সেই অ্যাপোক্যালিপ্টিক বিপর্যয়েরই সতর্কতাবাণী এই গ্রাফিতি। কেউ আবার দাবি করেন, নিছকই মজা করে লিনোলিয়াম এবং অ্যাসফাল্টের তৈরি এই পাথরগুলি রাস্তার ওপর স্থাপন করেছিলেন সাধারণ মানুষ। 

বলাই বাহুল্য এইসকল তত্ত্ব সবটাই ছিল মনগড়া। স্থায়ীভাবে এই রহস্যের সমাধান মেলে এরও বছর দশেক পর। চলতি শতকের প্রথম দশকে। নেপথ্যে ফিলাডেলফিয়ার শিল্পী ও সঙ্গীতঙ্গ জাস্টিন ড্যুয়ার। মাত্র ১৭ বছর বয়সে এই রহস্য উদ্ঘাটন অভিযানে নেমেই জাস্টিন খুঁজে বার করেন এক আশ্চর্য সূত্র। ‘টোয়েনবি’ বলতে যাঁর কথা বলা হচ্ছে এই পাথরে, তিনি আর কেউ নন বিশ শতকের ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক স্যার আর্নল্ড টোয়েনবি। এবং তাঁর গ্রন্থ ‘এক্সপেরিয়েন্সেস’-এ বর্ণিত একটি ধারণা বা তত্ত্বকেই ‘টোয়েনবি আইডিয়া’ নামে লেখা হয়েছে এই রহস্যময় প্রস্তরফলকে। কিন্তু কী সেই তত্ত্ব? 

আর্নল্ড টোয়েনবি রচিত এই উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পুনর্জন্ম বা 'রিসারেকশন'। তবে এই গল্প জাতিস্মর কিংবা সোনার কেল্লার মুকুলের পুনর্জন্মের থেকে খানিক ভিন্ন। আর্নল্ডের এই উপন্যাস অনুযায়ী, মানুষ পৃথিবীতে মারা যাওয়ার পর নতুন জন্ম নেয় বৃহস্পতি গ্রহে। ভিনগ্রহীর রূপে। সেই কারণেই হয়তো ফলকে লেখা হয় 'রিসারেক্ট ডেড অন জুপিটার'।

তবে শুধু আর্নল্ডই নন, তদন্ত সূত্রে জাস্টিন ড্যুয়ার উপস্থাপন করেন আরও এক গল্প। 'জুপিটার ভি (৫)' শিরোনামের এই গল্পটি লিখেছিলেন ব্রিটিশ ফিকশন লেখক স্যার আর্থার সি ক্লার্ক। এই গল্পেও আবর্তিত হয়েছে সেই পুনর্জন্মের প্রেক্ষিত। মজার বিষয় হল, আর্নল্ডের উপন্যাস থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এই রচনা আর্থারের। তাই পৃথিবী থেকে বৃহস্পতিগামী রকেটের নামও তিনি রেখেছিলেন 'টোয়েনবি আর্নল্ড'। ১৯৬৮ সালে এই গল্পের ওপর ভিত্তি করে মুক্তি পায় একটি চলচ্চিত্রও। যার নাম 'কিউপ্রিক ২০০১'। টোয়েনবি পাথরে উল্লেখিত 'কিউপ্রিক' কিংবা 'জুপিটার' যে এখান থেকেই এসেছে, তা বলার অপেক্ষা থাকে না। 

পরবর্তীতে জাস্টিনের এই টোয়েনবি-অভিযান ও রহস্যভেদকে কেন্দ্র করে মুক্তি পায় 'রিসারেক্ট ডেড' নামের আস্ত একটি তথ্যচিত্র। তবে মজার বিষয় হল, টোয়েনবি স্টোনের অর্থ উদ্ধার করতে পারলেও, সম্পূর্ণ রহস্যের সমাধান করতে পারেননি জাস্টিন। শুধু জাস্টিনই নন, আরও জাস্টিনের এই সূত্র প্রকাশ্যে আসার পর বহু মানুষই হাত লাগয়েছিলেন এই প্রকল্পে। কে বা কারা, কখন, কেন আর্নল্ডের এই মতবাদ এভাবে প্রচার করেছেন দু-দুটি মহাদেশজুড়ে, তা খুঁজে বের করাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। তবে দু'দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর আজও সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে রহস্যের কুয়াশায়...

Powered by Froala Editor