মানিক বন্দ্যোর গল্প থেকে মানিকবাবুর না-হওয়া ছবি

মানিকলমকারি – ১১

আগের পর্বে

সত্যজিতের ‘সিনেমার কথা’ প্রসঙ্গে কথা হয়েছে আগেই। সন্দেশ পত্রিকায় ১৯৬৭ সাল থেকে কয়েকটি কিস্তিতে বেরিয়েছিল সেই লেখা। তবে লেখা বলা ভুল হবে। ‘সিনেমার কথা’ আসলে একজন আদর্শ শিক্ষকের দিক থেকে হিসাবে শিশু-কিশোরদের জন্য হাতে কলমে সিনেমার ক্লাস। তবে পঞ্চমপর্বই সেই লেখার ক্লাসের অধ্যায় হয়ে রয়ে গেল। ‘ক্রমশ’ লিখে রাখার পরেও তা আর চালিয়ে যেতে পারেননি সত্যজিৎ। তবে সেই পাঁচটা ক্লাসেই কী কী শিখিয়ে গেলেন তিনি?

মানিকলমকারি-র এই কিস্তিতে দুজনেই মানিক। একজন তো মানিক সত্যজিৎ রায় আর অন্যজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ভেবে ভারি অদ্ভুত লাগে, আমাদের তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে দুজনের কাহিনি থেকে ছবি করলেন সত্যজিৎ, কেবল সমনামী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকেই করলেন না? শোনা যায়, 'পদ্মানদীর মাঝি' থেকে নাকি এক সময়ে ছবি করবেন ভেবেছিলেন সত্যজিৎ। কিন্তু সে বোধ করি ওই ভাবা পর্যন্তই। চিত্রনাট্য লেখার ধাপ অবধিও এগোয়নি সে ভাবনা। এটা ওটা ভাবতে ভাবতে, হঠাৎ মনে পড়ল, মানিক সত্যজিৎ রায় তো বন্দ্যোপাধ্যায় মানিকের একটি গল্প থেকে ছবি তৈরি করার কাজ অনেকখানিই এগিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ কিছু কথাবার্তার সূত্রে সে-কথাই আজ বলার। 

সত্যজিৎ তখনো পথের পাঁচালী-র শিশু কিশোর পাঠ্য সংস্করণ 'আম আঁটির ভেঁপু'-র জন্য ছবি আঁকা শুরু করেননি। তিনি ১৯৪৫ সালে আঁকবেন 'আম আঁটির ভেঁপু'-র জন্য ছবি আর তার আগের বছর ১৯৪৪-এ সত্যজিৎ আঁকলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের বই 'ভেজাল'-এর প্রচ্ছদ আর গল্পের বইটিতে প্রতি গল্পের জন্য ছিল যে হেডপিসগুলি, তা এঁকেছিলেন সত্যজিৎ আর সূর্য রায় নামে আরেক অসামান্য শিল্পী। 'বিলামসন' গল্পের অলংকরণ করেছিলেন সত্যজিৎ। সেটা ছবি আঁকার ধরন দেখে বেশ অনুমান করা যায়। মজার ব্যাপার সেই প্রচ্ছদে আবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বানানে লেখকের পদবিটি ক্যালিগ্রাফি বা লেখাঙ্কনে য-ফলা বর্জিত হয়ে পড়েছিল। এই গল্পগ্রন্থের অন্যতম গল্প ছিল 'বিলামসন'। সত্যজিৎ 'পথের পাঁচালী'-র চিত্রনাট্য তৈরি করার আগে যে তিনটি চিত্রনাট্য লেখেন তার একটি ছিল রবীন্দ্রনাথের 'ঘরে-বাইরে', আরেকটি ছিল শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ঝিন্দের বন্দি' আর তৃতীয়টি ছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ওই গল্প 'বিলামসন'। তিনি নিজেই এই কথা বলে গিয়েছিলেন তাঁর লেখা "পথের পাঁচালী" শীর্ষক ক্ষুদ্র প্রবন্ধে। লিখেছিলেন, "পথের পাঁচালী করার আগেই আমি 'ঘরে-বাইরে' ও অন্যান্য কয়েকটি বাংলা গল্প-উপন্যাসের (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বিলামসন', শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ঝিন্দের বন্দি' ইত্যাদি) চিত্রনাট্য লিখি।"

 আশ্চর্যের বিষয় হল, শুধু এই কাহিনির চিত্রনাট্য লেখা হয়নি, এই চিত্রনাট্য থেকে ছবি করার ব্যাপারটিও যে বেশ এগিয়েছিল, সেটা সত্যজিতের অন্য একটি লেখা থেকে জানা যায়। 

যদিও, সেই লেখাতে সত্যজিৎ আবার সেই ছবির নামটি বলেননি। তবে আর যা যা কথা বলেছেন, তার সঙ্গে মেলালে বেশ বোঝা যায়, সেই সব কথা ওই 'বিলামসন' প্রস্তুতির কাহিনিই বটে। 

আরও পড়ুন
সত্যজিতের চিত্রনাট্যের কর্মশালা

সত্যজিৎ অঙ্কিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি। এক্ষণ পত্রিকার প্রচ্ছদে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই 'বিলামসন' গল্পটি বেশ অদ্ভুত। স্টিফেন এফ বিলামসন সাহেবের গল্প বলতে বলতে যেন আসলে মানিক প্রায় দুশো বছরের ইংরেজ শাসনের প্রকৃতিকে বুঝিয়ে দেন। এক সম্পন্ন বাঙালি জমিদার মহীধর রায়ের বাড়িতে বা বলা ভালো নগরগড় নামের জমিদারিতে, হাজির হলেন এই বিলামসন সাহেব সপরিবার। সঙ্গে আছেন তাঁর স্ত্রী, মেয়ে অরেল্যে আর ছেলে আর্থার। ক্রমশ রায়ের সেকেলে বাড়ির লাগোয়া নতুন পুরো বাড়িটাই সে অধিকার করে নেয়। তার বদলে, বিলামসন মহীধরকে এলাকার নানা উন্নতি করাবার পরামর্শ দেয়। ভাঙা রাস্তা পাকা করা থেকে নতুন কলকারখানা স্থাপনের বুদ্ধি। এর ফলে এলাকার চেহারা বদল হচ্ছিল যেমন, তেমনই গল্পকার কথক আমাদের ধরিয়ে দিচ্ছিলেন, এই সব কাজের পেছনে বিলামসন আসলে স্বজাতীয় লোকেদের আরো কত উন্নতি ঘটাচ্ছিল। অথচ, ধীরে ধীরে উন্নতির কথা বলে, মহীধরকে বেশ কব্জা করে ফেলে বিলামসন। ক্রমশ, ক্ষমতা পেতে পেতে প্রকাশ্যেই উদ্ধত আর অত্যাচারী হয়ে ওঠে বিলামসন। প্রজাদের ঘর ভাঙা, ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, চাবুকের আঘাতে প্রজাদের রক্ত ঝরানো শুরু হল। আবার, প্রতিবাদ করলে যুবক স্বাধীনচেতা প্রজাকে যথোচিত শাস্তি দিতে প্রথমে তার ওপর নিজের পোষা হিংস্র কুকুর ছেড়ে দেওয়া আর সেই অত্যাচার সামলাতে গিয়ে প্রতিবাদী শহর-ফেরত ছেলেটি যখন তাঁর কুকুরকে মেরেই ফেলল, তার শাস্তি দিতে জীবন্ত ওই ছেলেটিকে পুড়িয়ে মারা পর্যন্ত অত্যাচার করার সব গুণপনাই প্রকাশিত হয় সেই সাহেবের কর্মকাণ্ডে। আস্তে আস্তে সাধারণ মানুষ ক্রুদ্ধ হয়, তাদের জেগে ওঠার সংকেত পেয়ে মহীধর পর্যন্ত বিলামসনকে সপরিবার এই দেশ থেকে চলে যেতে বলে। গল্পের বাইরেটা এই রকমই। 

আরও পড়ুন
সত্যজিতের বইতে ‘এ কাহাদের কণ্ঠস্বর?’

ভেজাল গ্রন্থের প্রচ্ছদ। শিল্পী সত্যজিৎ রায়।

তাহলে স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে লেখা এই গল্প থেকে স্বাধীনতার ঠিক পরেই একটি চিত্রনাট্য লেখেন। এত স্পষ্ট দেশবিষয়ক একটা ছবি করার কথা জীবনের প্রথম পর্বেই তাহলে ভেবেছিলেন সত্যজিৎ!

কিন্তু সে ছবি হল না কেন, তার কথাও বেশ রয়েছে তাঁর কলমকারির সাক্ষ্যে। যদিও সেই সাক্ষ্যে সত্যজিৎ আবার এই লেখাটির কথা সরাসরি বলেননি। এই যোগাযোগটা তৈরি করার কাজটা আমাদের। সেই সাক্ষ্যটি পাওয়া যাবে, সত্যজিতের ইংরাজি প্রবন্ধ গ্রন্থ 'আওয়ার ফিল্মস দেয়ার ফিল্মস'-এর ভূমিকা অংশে। সেখানে সত্যজিৎ লিখলেন, 'One of the screenplays I had turned out in my spare time was based on a short story by a well known Bengali writer. It concerned an overbearing English manager of a zamindari estate whose dark doings are brought to an end by a plucky Bengali youth with radical leanings" এই চিত্রনাট্য পড়ে শোনালেন তিনি এক প্রযোজককে। কৌতূহলপ্রদ তথ্য হল, সেই ছবির গল্প শুনতে সেখানে সেই প্রযোজক ছাড়া হাজির ছিলেন এক বিখ্যাত চিত্রগ্রাহক আর সেকালের এক বিখ্যাত চিত্রপরিচালক (তাঁদের নাম অবশ্যই বলেননি সত্যজিৎ)। প্রস্তুতি পর্বে তাঁকেও তাহলে এইভাবেই শোনাতে হয়েছিল নিজের চিত্রনাট্য। সত্যজিৎ লিখছেন, "Behind me, peering over my shoulder, sat a well-known director with many hits to his credits. I opened my script and started my recital." পড়ার মাঝখানে, প্রথম দৃশ্য পড়া হতেই, ওই 'হিট' পরিচালক ভদ্রলোক জিগ্যেস করে বসলেন, "how many climaxes do you have in your story?" এই উদ্ভট প্রশ্ন শুনে সত্যজিতের কী মনে হয়েছিল? তিনি বলছেন, "I could see that he had designs to nip me in the bud if I named a lower figure than the one he presumably prescribed as the obligatory minimum for a potential hit." সত্যজিৎ এর মধ্যেই শেষ করলেন তাঁর পড়া। প্রযোজক ভদ্রলোকের পছন্দও হল। শুধু তাঁর একটাই ছোট্ট সাজেশন আছে: "When I finished the producer said he liked the story very much, and had a small suggestion to make: in the final scene of confrontation, where the hero gives the now cringing English manager a piece of his mind, his words should end with the peremptory exhortation: 'Quit India." সত্যজিতের এর পরবর্তী বাক্যটি ছোট্ট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ। আর তা হল, "The film was never made." 

আরও পড়ুন
এক গল্পই দু-বার দু-ভাবে লিখলেন সত্যজিৎ

ভেজাল গ্রন্থটির আখ্যাপত্র ও মুদ্রকপত্র

 

 

আরও পড়ুন
সত্যজিতের সিনেমার ক্লাস-৩

হল তো না। হলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প থেকেই বুঝি হত, সত্যজিতের প্রথম ছবি। কী আশ্চর্য। তখন হল না আর কখনোই হল না, এক মানিকের কাহিনি থেকে আরেক মানিকের ছবি। আচ্ছা, সত্যজিতের সেই 'বিলামসন'-এর চিত্রনাট্যটা গেল কোথায়? সত্যজিৎ কি আর তাঁর ছবির নাম 'বিলামসন' দিতেন? নিশ্চয়ই না। থাহলে, পাল্টে কী করেছিলেন? এইসব সন্ধান করে সত্যজিতের জীবনী রচনার নতুন উপাদান খুঁজে বার করা দরকার। 

বিলামসন গল্পের হেডপিস। শিল্পী: সত্যজিৎ রায়।

 

প্রসঙ্গত, এখানে একটা ছোট্টো মজার মুদ্রণপ্রমাদগত অ্যানেকডোট বলে নিই। সত্যজিৎ রায়ের 'প্রবন্ধ সংগ্রহ' বইতে আর নর্থ ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির মুখপত্র 'চিত্রভাষ'-এর 'অগ্রন্থিত সত্যজিৎ' সংখ্যার পাঠেও উদ্ধৃত অংশে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'বিলামসন' হয়ে গিয়েছে 'বিলাসমন'। বইটির প্রুফ দেখতে গিয়ে নিশ্চয়ই কারো মনে হয়েছিল, 'বিলামসন' আবার কী নাম? মানিকের লেখা গল্পের নাম হিসেবে বরং 'বিলাসমন' বেশ লাগসই! অতএব, মুদ্রণপ্রমাদে 'বিলামসন' হল কি না 'বিলাসমন!'

মানিকের গল্পের পাঠে 'বিলামসন'

 


প্রবন্ধ সংগ্রহের পাঠে হল 'বিলাসমন'!!

 

নানা আলোচনায় অনেক সত্যজিৎ গবেষক আলোচকরাও এই না-হওয়া ছবিটির নাম 'বিলাসমন' বলেন, শুনেছি। এবার থেকে এইটুকু আশা করি আমরা শুধরে নেব আর প্রবন্ধ সংগ্রহের আগামী সংস্করণে নিশ্চয়ই এই বর্ণবিপর্যাসগত ভুলটুকুন প্রকাশকরা সানুগ্রহ শুধরে নেবেন।

Powered by Froala Editor

Latest News See More

avcılar escortbahçeşehir escortdeneme bonusu veren sitelerbahis siteleri