পৌঁছতে পারেননি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ, আকাশবাণীতে সেবার স্তোত্রপাঠের দায়িত্বে নাজির আহমদ?

বাঙালির প্রাণের অনুষ্ঠান- মহালয়ার ভোরে আকাশবাণীতে বেজে ওঠা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। তাকে নিয়ে অজস্র গল্প, স্মৃতিমেদুরতা। কিন্তু ঐতিহ্যের পথ বেয়ে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা এই অনুষ্ঠানের মধ্যেও লুকিয়ে আছে ‘অন্যরকম’ অনেক কাহিনি। বারবার পরিবর্তনের পথে হাঁটা, এই ‘অন্যরকম’ হয়ে উঠতে পারা মহিষাসুরমর্দিনীর ঐতিহ্যেরই অঙ্গ। ১৯৭৬ সালের ‘পরিবর্তন’ ছিল সরকারি সিদ্ধান্ত, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র বদলে ‘দেবিং দুর্গতিহারিণীং’ সম্প্রচারিত হলে তা মানুষজন মেনে নেননি। দেখা দিয়েছিল প্রবল বিক্ষোভ। ফলে পূর্বগৌরবে ফিরিয়ে আনা হয় সেই ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ - যা সাধারণের ভাষায় ‘মহালয়া’র সমার্থক।

কিন্তু এই অনুষ্ঠানও যে অপরিবর্তনীয়, ঐতিহ্যবাহী হলে যে তাকে একইরকম হতে হবে চিরকাল - তা মোটেই নয়। বেতারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সাময়িক সমস্যা ও তার সমাধানের স্বাভাবিক নিয়মে, অথবা শিল্পের অভিনবত্বের খাতিরে আরও অনেকবার এমন ‘অন্যরকম’ হয়েছে মহিষাসুরমর্দিনী। পঙ্কজকুমার মল্লিকের সঙ্গে একবার বেতার-কর্তৃপক্ষের মনোমালিন্য হয়, এর ফলে ১৯৪৪ ও ১৯৪৫ – এই দু বছর তিনি  অনুষ্ঠানের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান৷ ১৯৪৪-এ গানের সুর প্রায় একইরকম রেখে পুরো অনুষ্ঠানটির সঙ্গীত পরিচালনার ভার দেওয়া হয় পূর্বের অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত এক তরুণ শিল্পীকে - তাঁর নাম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়৷ ঘটনাটি বিশদে জানা যায় বিকাশ রায়ের স্মৃতিচারণায়। ১৯৪৫ সালে সম্প্রচারিত হয় সম্পূর্ণ আলাদা একটি অনুষ্ঠান – যদিও এটি শ্রোতাদের খুশি করতে ব্যর্থ হয়। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গীত-পরিচালক ছিলেন বিজনবালা ঘোষদস্তিদার ও শচীন দাশ মতিলাল। ১৯৪৬-এ সমস্যা মিটে যাওয়ায় আবার সঙ্গীতের দায়িত্বে ফিরে আসেন পঙ্কজ মল্লিক।

১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে কোন এক বছর বেশ ‘অন্যরকম’ ঘটেছিল - বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ে এসে পৌঁছতে পারেননি। সবার মাথায় হাত। ব্যবস্থাপনায় ছিলেন আকাশবাণীর অন্যতম ঘোষক ও বাচিক শিল্পী নাজির আহমদ। বাংলা আবৃত্তি করতেন চমৎকার, তাছাড়া ছাত্রাবস্থায় সংস্কৃতে লেটার মার্কস পেয়ে পাস করেছিলেন। নীলিমা সেনের সঙ্গে ‘কচ ও দেবযানী’তে তাঁর অভিনয় স্মরণীয় হয়ে আছে অনেক প্রবীণের স্মৃতিতে- লিখেছিলেন কবি শামসুর রহমান। যাই হোক, সেদিন উপায় না দেখে তাঁকেই অনুরোধ করা হয় ভাষ্যপাঠ আরম্ভ করে দিতে। প্রথমে আপত্তি করলেও সময় ও পরিস্থিতির বিচারে রাজি হয়ে যান আহমদ, আরম্ভ করেন পাঠ। তার কিছুক্ষণ পরে এসে উপস্থিত হলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। আহমদের মুখে সুরেলা স্তোত্রপাঠ শুনে তিনিও তৃপ্ত; গুণী শিল্পীর সম্মান বজায় রেখে তিনি বলে উঠলেন – ‘নাজিরই করুক না, ভালোই তো করছে’। ঘটনাটির উল্লেখ পাওয়া যায় বাংলাদেশের খ্যাতিমান নাট্যব্যক্তিত্ব সাঈদ আহমদের রচনায়। কবি শামসুর রাহমানও এক স্মৃতিচারণায় এ ঘটনার কথা বলেছেন, তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী নাজির আহমদ নিজেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে তিনি কাজ চালিয়ে দিতে পারেন অনুমতি পেলে। অনুমতি দিয়েছিলেন আকাশবাণীর কর্তৃপক্ষ। কোন বছর এমন হয়েছিল সেকথা অবশ্য উল্লেখ করেননি কেউই। তবে নাজির সাহেব কলকাতা আকাশবাণীতে যোগ দেন ১৯৪২ সালে, আর ঢাকায় ফিরে যান ১৯৪৬-এ, সেখানকার বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। তাহলে ঘটনাটি নিশ্চয় এই কয়েক বছরের মধ্যেই ঘটেছিল। একসময় ‘অব্রাহ্মণ’ বীরেন্দ্রকৃষ্ণের চণ্ডীপাঠ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল যারা, সে বছর তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল, জানা নেই অবশ্য। যে বছরই এমন ঘটে থাকুক, সাল তারিখ নাই বা জানা থাক - ঘটনাটি শুনতে শুনতে মনে হয় না কি, যদি একবার কোনভাবে ফিরে যাওয়া্ যেত সেই সম্প্রীতির আলোয় উজ্জ্বল মহালয়ার ভোরে?

পরবর্তী কালে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, সে দিন সমালোচকদের তরফে ওঠা এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার। অল ইন্ডিয়া রেডিও-র বাংলা সম্প্রচারের দায়িত্বে  ছিলেন তিনি। বলেছিলেন, “অনুষ্ঠান করবে, তার আবার বামুন-কায়েত কী হে? আমাদের এই অনুষ্ঠানে যাঁরা বাজাবেন তাঁরা তো অর্ধেকেরও বেশি মুসলমান! তা হলে তো তাঁদের সকলকে বাদ দিয়ে ব্রাহ্মণদের ডেকে আনতে হয়।” তিনি সে দিন আরও মনে করিয়েছিলেন, বাঙালিদের সব চেয়ে বড় উৎসবের আগে ভূমিকা হিসেবে এই অনুষ্ঠান হবে। উৎসবের আবার ধর্ম কী! এর পরেই ছিল তাঁর কৌতুক। লেখক বাণীকুমারকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, “অনুষ্ঠান লিখছে তো এক বামুন, এতে হবে না বুঝি?” আবার  বাণীকুমার স্মিত হেসে জানিয়েছিলেন,  বীরেন ছাড়া আর কাউকে তিনি চণ্ডীপাঠ করতে দেবেন না। এ প্রসঙ্গে আরও বলতে হয়, ‘শান্তি দিলে ভরি’ গানটির সুর দিয়েছিলেন উস্তাদ সাগিরউদ্দিন খাঁ।

আর এখন আমরা যে সুরে ভাষ্যপাঠ শুনি, তাও তো অন্যরকম ছিল প্রথমদিকে। তখন অনুষ্ঠানের সহযোগী যন্ত্রশিল্পীদের মধ্যে নামকরা ছিলেন মুনশি আর আলি- দুই ভাই। সারেঙ্গি নিয়ে বসতেন মুনশি, আলি বাজাতেন চেলো, হারমোনিয়াম থাকত খুশি মহম্মদের হাতে। আরও কয়েকজন মুসলমান বাদ্যযন্ত্রী ছিলেন, যাঁরা বাংলা ভালো বুঝতেন না। তাঁদের মাতৃভাষা ছিল উর্দু। রাইচাঁদ বড়াল যন্ত্রশিল্পীদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, কোথায় আবহে সুর দিতে হবে, আবার কোন কোন জায়গায় বাজনা বন্ধ থাকবে। উর্দুভাষী শিল্পীরা সবাই হয়তো ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। 

যথারীতি রিহার্সাল শুরু হল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ শ্লোক পাঠ করে, একটু থেমে বাংলা গদ্য‌ আবৃত্তি শুরু করলেন– ‘আজ শুভ শারদোৎসব, জলে স্থলে প্রকৃতিতে আনন্দের বার্তা’… ( তখন ভাষ্য ছিল এরকম)। এ দিকে দেখা গেল, ভাষ্যপাঠক সংস্কৃত শ্লোক থেকে বাংলা গদ্যে এসে পড়লেও, সংস্কৃত ও বাংলার পার্থক্য‌ বুঝতে না পেরে, অথবা রাইচাদের নির্দেশ ভুলে গিয়ে - যাই হোক, অবাঙালি মুসলমান বাদকরা বাংলা কথার সুরে সুরেও এক রকম নিজেদের মতো করেই বাজাতে থাকলেন,  আর সবাই অবাক হয়ে দেখলেন, প্রস্তুতি না-থাকা সত্ত্বেও সেই গদ্যেোর সুরের সঙ্গে তাঁদের বাজনা কী চমৎকার ভাবে মিলে যাচ্ছে! বাঙালি যন্ত্রীরা তখনও থেমেছিলেন। তাঁরা ভেবে পাচ্ছিলেন না, কীভাবে এমন ভুল করে ফেলেছেন তাঁদের সহ-যন্ত্রীরা। কিন্তু যখন দেখলেন সেই কথা আর সুরের মেলবন্ধন এক অপূর্ব মাত্রা নিচ্ছে, তখন তাঁরাও সুর মিলিয়ে বাজাতে শুরু করলেন। এই দ্বিধাগ্রস্ত আধা-আবহের মধ্যেও একটা অন্যরকম মায়াবী সুর আসছে – মনে হল বীরেন্দ্রকৃষ্ণের। সেই সুরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনি ভাষ্য পড়তে শুরু করলেন সুর লাগিয়ে।  

আরও পড়ুন
বৃষ্টিভেজা শ্রাবণে প্রয়াত রবীন্দ্রনাথ, শেষযাত্রার ধারাবিবরণী দিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র

পরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ বলেছিলেন, একটা ছোট্ট ভুলে পুরো অনুষ্ঠানটাই ‘অখণ্ড সুরের প্রবাহে’ পরিণত হয়। মুগ্ধতা আর অভিনন্দনের বন্যায় উপচে পড়ল আকাশবাণীর দফতর। এভাবেই সৃষ্টি হল ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে’র সেই অপার্থিব ব্যঞ্জনা। এ প্রসঙ্গে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র নিজে লিখেছিলেন ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকায় – সেদিন যেন দেবী মহামায়া স্বয়ং তাঁর অদৃশ্য হাতে এমন অপূর্ব ধর্মীয় মেলবন্ধনের সুর বেঁধে দিয়েছিলেন।

তথ্যঋণ - সাঈদ আহমদ রচনাবলি, বাংলা অ্যাকাডেমি, ঢাকা
জীবনের সাতরং, সাঈদ আহমদ, সাহিত্য প্রকাশ; পৃষ্ঠা - ১১১-১১৩
কালের ধুলোয় লেখা, শামসুর রহমান, অন্যপ্রকাশ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা - ৬৬-৬৭

Powered by Froala Editor

আরও পড়ুন
মহালয়ার ৩৫ দিন পরে শুরু হবে পুজো, নতুন নিয়ম ২০২০-তে

Latest News See More

avcılar escortgaziantep escortesenyurt escortantep escortbahçeşehir escort