দ্রোণাচার্যকে রাজকুমারদের অস্ত্রশিক্ষার ভার দিলেন ভীষ্ম, দ্বিধাগ্রস্ত দ্রোণ

মহাভারতে রাজনীতি – ২৩

আগের পর্বে

কৃপাচার্যের গৃহে বসে দ্রোণ পিতামহ বৃহস্পতির কথা ভাবতে লাগলেন। একসময় দেবগুরু বৃহস্পতির স্ত্রী তারার প্রতি আসক্ত হয়েছিলেন দেবতাদের তৎকালীন নেতা চন্দ্র। তারা চন্দ্রগৃহে গমন করেছিলেন। সেখানে বারবার অপমানিত হয়ে বৃহস্পতি দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় হাজির হন। চন্দ্র ইন্দ্রের বার্তা ফিরিয়ে দিলে যুদ্ধ শুরু হয়। তখন অসুররা চন্দ্রের বাহিনীতে এবং মহাদেব ইন্দ্রের বাহিনীতে যোগ দেন। চন্দ্রের বাহিনীতে অনেক দেবতাও ছিলেন। শেষে ব্রহ্মার মধ্যস্থতায় যুদ্ধের মীমাংসা হয়। চন্দ্র ও তারার পুত্র বুধের ঔরসে জন্ম হয় পুরূরবার। সেখান থেকেই হস্তিনাপুরের রাজত্ব শুরু। এদিকে ভীষ্ম রাজকুমারদের কাছে দ্রোণের সংবাদ শুনে তাঁর অভীষ্ট জানতে চান। দ্রোণ তাঁর শিক্ষার বিবরণ দিয়ে জানান, তিনি রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষার দায়িত্ব নিতে চান। তারপর…


দেবব্রত ভীষ্ম তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি ব্রাহ্মণ হয়ে কী করে ক্ষত্রিয়বৃত্তি করবেন? দ্রোণ জবাব দিলেন, কৃপাচার্য আমার শ্যালক; তাঁকে আপনার পিতা মহারাজ শান্তনু যখন সেই অনুমতি দিয়েছিলেন, ফলে আমার ক্ষেত্রেও বাধা থাকা উচিত নয়। হে দেবব্রত-ভীষ্ম! আপনিই রাষ্ট্র, আপনি আমাকে সাহায্য করুন। আমার পুত্র অশ্বত্থামাকে আমি ঠিক মতো আহার দিতে পারি না। সেই জন্য সখা দ্রুপদের কাছে সাহায্য চাইতে গেলে তিনি আমাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। এই অপমানের পর আমি ক্রুদ্ধ হয়ে হস্তিনায় চলে এসেছি। এখন আপনি বলুন, আপনার কোন প্রিয় কার্য করব?  

ভীষ্ম বললেন, আপনি রাজকুমারদের অস্ত্রশিক্ষা দিন। দ্রোণাচার্য কিঞ্চিৎ ভাবলেন, তার পর বললেন, বালকদের অস্ত্রশিক্ষার ভার আচার্য কৃপ গ্রহণ করেছেন, এখন আমি যদি তাঁদের শিক্ষা দিই তাহলে কৃপ রুষ্ট হতে পারেন। আপনি বরং আমাকে কিছু ধন দিন, আমি তা গ্রহণ করে প্রস্থান করি।

ভীষ্ম বললেন, না। কৃপ যেমন আছেন, তেমনই থাকবেন। আমরা তাঁর যথোচিত ভরণ ও সম্মান করব। আমি ধনু জ্যামুক্ত করুন, রাজকুমারদের শিক্ষা দিন। আপনি আমার পৌত্রদের আচার্য হলেন। 

আরও পড়ুন
গুরুপত্নীতে আসক্ত চন্দ্র, ক্রুদ্ধ বৃহস্পতি হাজির ইন্দ্রের দরবারে

একটি সুন্দর গৃহে দ্রোণ বাস করতে লাগলেন। কৌরব ছাড়া তাঁর কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতে এলেন বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশীয় রাজকুমাররা। এলেন সূতপুত্র কর্ণ। দ্রোণ তাঁকে শিষ্য পদে বরণ করলেন। দ্রোণ কুমারদের শিক্ষা দিতে লাগলেন এবং ভাবলেন, কী উপায়ে দ্রুপদকে শায়েস্তা করা যায়! দ্রুপদকে শাস্তি না দিলে তাঁর মনে শান্তি ফিরে আসবে না। তিনি নিজেও জানেন, ব্রাহ্মণের এত ক্রোধ ভাল নয়। পাণ্ডুর পুত্রদের মধ্যে অর্জুন সবচেয়ে ভালো ধনুর্ধর। নিজের পুত্র অশ্বত্থামার প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকলেও অর্জুন শিক্ষা গ্রহণে সবচেয়ে পটু। তাঁর যেমন মেধা আছে, তেমনি আছে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা। 

এর মধ্যে একদিন সেখানে এলেন হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য। তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত বলা দরকার।

আরও পড়ুন
ব্রাহ্মণ হয়েও অর্থনীতির চর্চা, সামাজিক সব গণ্ডি ভেঙে দিয়েছিলেন ভরদ্বাজ

একলব্য একদিন বন থেকে বেরোল হস্তিনানগরের দিকে, প্রথমে যেতে হবে অনেকটা পশ্চিমে, তার পর উত্তরে হপ্তা খানেকের রাস্তা। ঘোড়ার পিঠে চেপে যাওয়াই মনস্থ করল সে। হাতি বেশ মন্থর প্রাণী। অনেকটা খাবার, আর প্রচুর তীর ধনুক সঙ্গে নিল সে। প্রথমে হস্তিনানগরের বাজারে গিয়ে সে তীর ধনুক বেচবে, তার পর খোঁজখবর নিয়ে যাবে আচার্য দ্রোণের কাছে। এই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে প্রথমে তাকে মহানদী পার হয়ে যেতে হবে চেদি রাজ্যে। সেই সব পথ জেনে নিয়েছে একলব্য। 

মহানদী পার হলেই তার গা ছমছম করে। ঘোড়া সমেত এই নদী পেরনো খুব সহজ নয়। এই জলধারাই নিষাদরাজ্যের প্রাণরেখা। পানের জল থেকে মাছ ধরা সব হয় এই নদীকে কেন্দ্র করে। নদী পার হয়ে অনেকটা পথ এগিয়ে গেল একলব্য, তেজি অশ্বের পিঠে চড়ে। নিজের খাবার, ঘোড়ার খাবার সব নেওয়া সম্ভব নয়। ঘোড়া তবু ঘাস খেয়ে থাকতে পারে, কিন্তু শুধু ঘাসে ঘোড়া তেজিয়ান থাকে না। তাকে ছোলা গুড় খাওয়াতে হয়, দিতে হয় ধেনো মদও। সে সব কোথায় পাবে একলব্য? প্রায় তিন দিন তিন রাত কখনও কখনও চলে, কখনও বিশ্রাম নিয়ে তারা—একলব্য ও ঘোড়াটি পৌঁছলো চেদি রাজ্যে। এখানে রাজত্ব করেন শিশুপাল। তিনি বৃষ্ণিবংশীয় রাজা, পিতা হিরণ্যধনুর বন্ধু মানুষ। 

আরও পড়ুন
কালকূট খাওয়ালেন দুর্যোধন, গঙ্গার তীরে বেহুঁশ মহাপরাক্রম ভীম

রাজার আতিথ্যে কোনও ত্রুটি ছিল না। কয়েক দিন বেশ আরামে ও আয়াসে কাটিয়ে ঘোড়া বদলে নিয়ে এই বার উত্তরে যাওয়ার পরিকল্পনা করল একলব্য। 

শিশুপাল বললেন, কোনো দরকার ছিল না হস্তিনায় যাওয়া। পূর্ব দেশে তীরন্দাজের আকাল পড়েছে নাকি হে যে তুমি ছুটছো উত্তর পানে? আমার রাজ্যেই আছেন অনেক বড়ো রুস্তম, তারা তোমাকে তীর ধনুক থেকে শুরু করে গদা সব শিখিয়ে দেবে। তাছাড়া, তোমার পিতা হিরণ্যধনু তো মস্ত তীরন্দাজ! রাজা জরাসন্ধ তো এমনি এমনি তাকে সেনানায়ক করেনি!

আরও পড়ুন
যুধিষ্ঠিরকে হস্তিনাপুরের রাজা করতে চাইলেন বিদুর, ক্ষুব্ধ দুর্যোধন

একলব্য বলে, আমাকে আচার্য দ্রোণের নামখানিই বড্ড টানছে হে পিতৃবন্ধু! শুনেছি তিনি সমগ্র ধনুর্বিদ্যা লাভ করেছেন মহর্ষি পরশুরামের কাছে।

“আমিও শুনেছি। কিন্তু ও সব হল ইন্দ্রজাল। আসল ক্ষমতা হল লাঠি। অতিসামীপ্যের জন্য। অনতিদূর থেকে তীরধনুক। অতিদূরের জন্য আগ্নেয়াস্ত্র। সব শিখতে পারবে এই চেদি রাজ্যে। এ হল লাঠির রাজা উপরিচর বসুর দেশ।”

“সে কাহিনি শুনতে ইচ্ছা করি।”

শিশুপাল বললেন, বলছি সেই উপাখ্যান। তোমার পিতা হিরণ্য নিশ্চয় এতদিনে তোমাকে বলেছেন যে তোমার পিতা ও আমার মাতা ভাইবোন?

“কই না তো! তবে শুনেছি, আমি নাকি শূরসেনের পুত্র দেবশ্রবার ঔরসে জন্মেছি। ব্যস, এইটুকুই!”

“ঠিক শুনেছো বৎস! আমার মাতা শ্রুতশ্রবা দেবশ্রবার দিদি। তুমি আমার বন্ধুপুত্র হলেও আসলে তুমি আমার মামাতো ভাই!”

একলব্য বলে, এসব আমার মাথায় ঢুকছে না পিতৃব্য! 

“শোনো। শূরসেনের দশ পুত্র আর পাঁচ কন্যা। পুত্রদের মধ্যে সবার বড় বসুদেব, তার পর দেবভাগ, দেবশ্রবা, আনক, সৃঞ্জয়, শ্যামক, কঙ্ক, শমীক, বৎসক ও বৃক। শূরসেনের পাঁচ কন্যা—পৃথা, শ্রুতদেবা, শ্রুতকীর্তি, শ্রুতশ্রবা ও রাজাধিদেবী। হস্তিনা গেলে পৃথা মানে আমার মাসি আর তোমার পিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ কোরো।”

একলব্যের মাথায় ঘুরছে অস্ত্রশিক্ষার কথা। তিনি এই সব আত্মীয়তার কূটকচালি শুনতে চান না। শিশুপালকে একলব্য জানালেন, আগামীকাল ভোরে হস্তিনার উদ্দেশে রওনা দেবেন তিনি। আজ রাতে উপরিচর বসুর লাঠি বা দণ্ডের কাহিনি শুনে নিতে চান।

শিশুপাল শুরু করেন কাহিনি।

এই যে দেশ দেখছো, এর নাম চেদি। এই দেশের দু পাশে আছে নর্মদা আর গোদাবরী নদী। এখানকার রাজা উপরিচর আসলে আকাশচর ছিলেন, অনেকটা পাখির মতো। সমাজের উচ্চ স্থানে তাঁর বাস, আমার বা তোমার পিতার মতো রাজা তিনি ছিলেন না যে গরিব-গুবরোদের সঙ্গে সময় কাটাবেন। ইন্দ্রের সখা উপরিচরের ছিল স্ফটিকময় বিমান, অম্লান পঙ্কজের বৈজয়ন্তীমালা এবং একটি বংশনির্মিত ষষ্ঠী। 

একলব্য জিজ্ঞাসা করে, বংশনির্মিত ষষ্ঠী মানে কী? 

শিশুপাল জবাব দিলেন, বাঁশ, বাঁশের তৈরি লাঠি। এই ষষ্ঠীর নিয়মিত পুজো করা হত। লাঠিকে ভোগ দেওয়া হত। অগ্রহায়ণ মাসে সেই পূজা হত পাঁচ দিন ধরে—ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী। এই সময় সারা রাজ্যে ইন্দ্রের পতাকা উত্তোলন করা থাকত। উপরিচরের দেখাদেখি বিদেশি রাজা ইন্দ্রের পতাকা অন্য রাজাদের মধ্যেও জনপ্রিয় হল। লাঠিই হল প্রজাদের মহৌষধ। উপরিচরের ছিল পাঁচ পুত্র—তারা পাঁচ দেশের শাসক হয়েছিল। উপরিচরের যে চেদি রাজ্য ছিল তার রাজধানীর নাম শুক্তিমতী। নদীর নামে নগরের এমন নামকরণ। শুক্তির উৎপত্তিস্থল হল স্ত্রীযোনি, তার প্রবাহ শুধু রাজধানীর পাশে কেন সারা রাজ্য জুড়ে ছিল। আর ছিল কোলাহল পর্বত, যারা হল বা কর্ষণের জন্য সর্বদা মুখিয়ে থাকে। শুক্তিমতী নদীর আহ্বানে কোলাহল পর্বত তার সঙ্গে মিলিত হয়। নদীর গর্ভে জন্ম নেয় এক পুত্র আর এক কন্যা। 

জ্ঞানীবৃদ্ধরা অবশ্য বলে থাকেন, কামান্ধ কোলাহল পর্বত শুক্তিমতী নদীকে ধর্ষণ করে। ওই যে পুত্রকন্যার জন্ম হল, রাষ্ট্র তাকে নিজের ঘরে স্থান দিল। পুত্রটি হল চেদির সেনাপতি আর কন্যাটি চেদির রাজমহিষী। কন্যার নাম গিরিকা। রাজা গিরিকার সঙ্গে নিয়মিত সঙ্গম করেন, একমাত্র ঋতুস্নাতা অবস্থা ছাড়া। সেই সময় উপরিচর বেরিয়ে যেতেন মৃগয়ায়। এই রকম একবার তিনি শিকারে গিয়েছেন। পথে গিরিকাকে স্মরণ করে তাঁর শুক্রস্খলন হয়। সেই স্খলিত বীর্য এক শ্যেনপক্ষী পত্রপুটে নিয়ে উড়ে যায়। পথে আর এক শ্যেনপক্ষীর আক্রমণে সেই শুক্র যমুনার জলে পড়ে যায়। সেই জলে ছিল এক মৎসী—ব্রহ্মশাপগ্রস্থ অদ্রিকা নামের এক অপ্সরা।

অলংকরণ – প্রণবশ্রী হাজরা

Powered by Froala Editor

More From Author See More