সলিল চৌধুরীর গান গাইলে থাকা যাবে না শান্তিনিকেতনে, রেকর্ডিং করেও পিছিয়ে এলেন কণিকা

১৯৫২ কি ’৫৩ সালের কথা। কলকাতার এইচএমভি স্টুডিওর রিহার্সাল রুমে কাজ করছেন সলিল চৌধুরী। তাঁর গান ততদিনে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর সুরের আরও গভীরে গিয়ে পরিচয় সেরে নিচ্ছে বাঙালি। বলিউডও বাদ যায়নি। যাই হোক, কাজের ফাঁকেই খুলে গেল স্টুডিওর দরজা। ঘরে ঢুকলেন ‘মোহর’, অর্থাৎ কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। এইচএমভি স্টুডিওর ভেতরেই দুই কিংবদন্তি শিল্পীর প্রথম সাক্ষাত।

সলিলের গান পৌঁছে গিয়েছিল শান্তিনিকেতনেও। আজীবন রবীন্দ্রপ্রেমী কণিকাও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সেই সুরে। ঠিক করেছিলেন, এই সুরকারের সঙ্গে কাজ করতেই হবে তাঁকে। সেই সূত্রেই এইচএমভি’র আলাপপর্ব। তিনিও সলিল চৌধুরীর গান গাইতে চান— কথার ফাঁকে সেইদিন বলেই ফেললেন কণিকা। সলিলও জানতেন তাঁর গলার জাদু। কণিকার কথা ভোলেননি তিনি; দিন কয়েকের মধ্যেই বেঁধে ফেললেন দু’দুটি গান। কণিকা যারপরনাই খুশি! রেকর্ডিংও দ্রুত হয়ে গেল… 

এরপরই এল আসল বিপদ। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর এক যুগ অতিক্রান্ত হতে চলল। শান্তিনিকেতন গুরুদেবের গান নিয়ে যথেষ্ট সাবধানী। একইসঙ্গে সমস্ত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের দিকে নজর রাখা হচ্ছে। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সলিল চৌধুরীর সুরে গান রেকর্ড করেছেন— এমন খবর ছোটখাটো বিস্ফোরণ তৈরি করল শান্তিনিকেতনে। রবীন্দ্রসঙ্গীত ছেড়ে শেষ পর্যন্ত আধুনিক সুরকারদের পথ বাছলেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয় মোহর? কর্তৃপক্ষের নির্দেশ, যে কোনো একটা পথ বাছতে হবে। হয় রবীন্দ্রসঙ্গীত, নয়তো আধুনিক গান। ওই গানদুটি বাজারে এলে কণিকাকে শান্তিনিকেতন ছাড়তে হবে, এমন কথাও বলা হল। 

চিরকালের শান্ত কণিকা এই সংঘাতে যেতে চাইলেন না। রবীন্দ্রনাথকে তো চিরকাল নিজের সঙ্গে নিয়ে চলেছিলেন তিনি! তাহলে কেন এরকম বলা হচ্ছে তাঁকে? সলিল চৌধুরীর সঙ্গে গান করার ইচ্ছা তাঁর, সেই সুর শান্তিনিকেতন বুঝল না? কণিকা নিজে অশান্তি চান না। যা চাইছেন, তাই হোক তবে! সলিল চৌধুরীকে চিঠি লিখে সমস্তটা জানালেন। শেষে বললেন, “কর্তৃপক্ষ বলেছেন, তোমার গান গাইলে আমাকে শান্তিনিকেতন ছাড়তে হবে। কাজেই আমাকে ক্ষমা করো ভাই।” সলিল নিজেও আশাহত। শেষ পর্যন্ত উৎপলা সেনকে দিয়ে সেই দুটি গান গাওয়ালেন তিনি— ‘প্রান্তরের গান আমার’ এবং ‘আমার কিছু মনের আশা’। পুজোয় শহরের বুকে বেজে উঠল সেই গান। কণিকার গাওয়া রেকর্ডদুটির কোনো হদিশই পাওয়া গেল না আর। 

আরও পড়ুন
কণিকা-কে রঙের চৌবাচ্চায় ফেলে দিলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, ‘শাস্তি’র ব্যবস্থা রবীন্দ্রনাথের

শুধু কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় নন, আরও বেশ কয়েকজন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর জীবন ও গানের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন সলিল চৌধুরী। মনে পড়ে সুচিত্রা মিত্রের কথাও। কণিকা-সুচিত্রা যেন রাবীন্দ্রিক চিত্রাঙ্গদার দুটি রূপ। দুজনের কণ্ঠ কতই না ইতিহাস তৈরি করে গিয়েছিল! মোহরের মতো শান্ত ছিলেন না সুচিত্রা; বরং ‘আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভুত’-এর মন্ত্রই বারবার আউড়ে গেছেন সুচিত্রা। শান্তিনিকেতনের পরিবেশেই নিজেকে আটকে রাখেননি, চলে গিয়েছিলেন আইপিটিএ-র মতো জায়গায়। সেখানেই আলাপ সলিল চৌধুরীর সঙ্গে। 

তখনও কণিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি সলিলের। ১৯৫০ সালে সলিলের কথায় আর সুরে গান গাইলেন সুচিত্রা— ‘সেই মেয়ে’। গাঁয়ের লোক যেমনই বলুক, আমরা তো দেখেছি ‘তার কালো হরিণ চোখ’। রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি, সলিলের হাত ধরে এসে পৌঁছেছিল দেশভাগের বাংলায়। সেই কষ্টের ছবি দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকেই উঠে আসা ‘সেই মেয়ে’। সুচিত্রা মিত্রের গলায় সেই গানও অসাধারণ হয়ে ওঠে। এবারও প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন রবীন্দ্র-অনুরাগীরা। গর্জে ওঠে শান্তিনিকেতন। কেন? এটা নাকি কৃষ্ণকলির ‘প্যারোডি’; রবীন্দ্রনাথকে অপমান করা হয়েছে। একজন ‘কমিউনিস্টের’ সঙ্গে মিলে এই কাজ কী করে করতে পারলেন সুচিত্রা? তাঁর সামনেই ভাঙা হল গানের ডিস্ক। হায় হায় রব উঠল! কিন্তু সুচিত্রা নিজের জায়গায় অনড়। এটা কখনই প্যারোডি নয়; আর সলিল চৌধুরীর সঙ্গীত প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন করাও উচিত নয় - সটান বলেছিলেন তিনি। 

আরও পড়ুন
সলিলের সঙ্গে এক সোফায় নয় কিছুতেই, মাটিতে বসে গান শিখলেন কিশোরকুমার

এই প্রসঙ্গে একজনের কথা না বললেই নয়। বলা ভালো, বাংলা গানের মূল ধারায় সলিল চৌধুরীর প্রবেশ তাঁর সঙ্গেই। তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সলিল-হেমন্ত জুটি প্রায় কিংবদন্তি হয়ে গেছে আজ। ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূ’ থেকে শুরু হয়েছিল দৌড়। ‘রানার’-কে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। একের পর এক কালজয়ী গান, নতুন ধারার সুর। গণনাট্য এসব গান ভালোভাবে নেয়নি। তাতে থোড়াই কেয়ার! হেমন্ত না থাকলে যে ‘সলিল চৌধুরী’ও তৈরি হত না, এমন কথা নিজের কণ্ঠেই বারবার বলেছেন তিনি। দুজনে মিলে কোথায় না ম্যাজিক তৈরি করেননি! কখনও গণসঙ্গীত, কখনও সিনেমা— মাইলস্টোন তৈরি করলেন দুজনে। 

গণনাট্য, গান, মানুষ আর রবীন্দ্রনাথ— সবকিছু মিলে তৈরি হয়েছিল আরেক যোগসূত্র। তিনি দেবব্রত বিশ্বাস। মানুষের মাঝে ছুটে যাচ্ছেন তাঁরা, প্রতিবাদ করছেন গানের মধ্যে দিয়ে। রাস্তায় রাস্তায় বেরোচ্ছে মিছিল। আর জর্জ বিশ্বাসের সঙ্গী সলিল চৌধুরী আর রবীন্দ্রনাথের সুর। এইভাবেই কোথাও যেন মিলেমিশে গিয়েছিল সুতোগুলো। সিনেমার ভেতরে থেকেও আদর্শ ভোলেননি সলিল চৌধুরী। ভোলেননি গণসঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথকে। ঝড় যতই আসুক, যতই কথা উঠুক; সত্যি তো সত্যিই থেকে যায়। তাই না!


আরও পড়ুন
মনোমালিন্য চরমে, সুচিত্রা মিত্রের থেকে এক টাকা হলেও বেশি পারিশ্রমিক চাইলেন কণিকা

তথ্যসূত্র -
১) ‘অন্তঃসলিল’, রানা চক্রবর্তী, এখন খবর
২) 'বাংলা গানের স্বর্ণযুগকে স্পর্শ করা যায়', স্বপন সোম, আনন্দবাজার পত্রিকা
৩) 'শিল্পী যখন আক্রান্ত', অভীক চট্টোপাধ্যায়, আনন্দবাজার পত্রিকা

Powered by Froala Editor