গ্রেগর সামসা এবং তার বাঙালি বন্ধুরা

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের নায়ক বিজন ভোরবেলা বাথরুমে গিয়ে আবিষ্কার করে, ‘সে রক্তবমি করছে’, যা পরে বদলে হয়েছিল - ‘তার পেচ্ছাবের বদলে আজ রক্ত বেরোচ্ছে, সে রক্ত প্রস্রাব করছে।’ গল্পটি কাল্ট হিসেবে আজ গ্রাহ্য, নাম ছিল ‘বিজনের রক্তমাংস’। প্রকাশকাল ১৯৬০, যার আট বছর পরে ১৯৬৮ সালে মতি নন্দী ‘দ্বাদশ ব্যক্তি’ উপন্যাস শুরু করেন এইভাবে,
‘আজ ঘুম থেকে উঠতে তারক আটটা বাজিয়ে ফেলেছে। কলঘরে গিয়ে প্রথমে জ্বালা ক’রে ওঠায়... (সে দেখে) পুঁজ বেরোচ্ছে কিনা। ... আবার জ্বালা করতে বিমর্ষ হয়ে ভাবল, তাহলে বোধহয় হয়েছে।’

অবিবাহিত যুবক বিজন তার দিন শুরু করেছিল ‘হেমাচুরিয়া’ (পেচ্ছাবের সঙ্গে রক্ত বেরোনোর ডাক্তারি নাম) অসুখ দিয়ে। তারক, বিজনের মতোই সাম্প্রতিক যুবক (স্ত্রীর নাম রেণু)... পেচ্ছাবে জ্বালা হওয়ায় আশঙ্কা করেছে ‘গনোরিয়া’-র... বাঁধাধরা কোর্সের পেনিসিলিন ইঞ্জেকশন নিতে সে বারম্বার হানা দেবে ডিসপেনসারি-তে।  বিজন ও তারক, দুজনেই বেশ্যাপটি গিয়ে থাকে এবং যৌনাঙ্গ-সংক্রান্ত দু’টি অসুখ তারা সেখানেই বাধিয়েছে। এখানে বলা উচিৎ - বিজন যে বেশ্যার ঘরে যায় এবং অসুখ জানবার পরেও যাবে - তার নামও ছিল রেণু। 

ছয় দশকের ‘নুভেল ভাগ’ চলচ্চিত্র যারা শুরু করেন, সেই ফরাসি যুবকেরা (জঁ লুক গদার, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, জাক রিভেত প্রমুখ) নিজেদের ছবিতে এভাবেই পরস্পরের উল্লেখ-উদ্ধৃতি রেখে দিতেন – বন্ধুত্বের জ্যান্ত চিহ্ন হিসেবে। ত্রুফো-র প্রথম ছবি ‘ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’-এ যেমন জাক রিভেতের পরিকল্পিত (এবং মুক্তি না-পাওয়া) ছবির রেফারেন্স থাকে, জঁ লুক একই ভাবে নিজের ‘ভিভরে সা ভি’-র একটি দৃশ্যে গাড়ির জানলা দিয়ে দেখিয়ে নেন ত্রুফো-র অতিখ্যাত ‘জুল এ জিম’ ছবি দেখতে সিনেমা-হলে দর্শকের লম্বা লাইন।    

...ভাবতে ভালো লাগে যে সহকর্মী সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের লেখার উদ্দেশে এভাবেই ‘থাম্বস আপ’ জানাচ্ছেন মতি নন্দী। নিজের উপন্যাস তাঁরও একই মোচড় দিয়ে শুরু – ঘুম থেকে ওঠা, বাথরুমে যাওয়া ও পেচ্ছাব করতে গিয়ে অসুখকে জানা। মতি ও সন্দীপনের অল্টার-ইগো (তারক, বিজন) দুজনেই এরপর অফিস বেরোবে, একঘেয়ে কলকাতায় তারা হয়ে যাবে অচেনা মানুষ – আউটসাইডার... ভিড়ের ছোঁয়াচ তাদের মনে লাগবে না, কেওসে ভরে যাবে তাদের বাস্তব...  নিজেদের অসুখকে পুঁজি ক’রে তারা ক্রমশ এগিয়ে যাবে ক্রনিক অন্ধকার-যাত্রায়।

এই যে নিদ্রোত্থিত যুবকের অসুখ-উপলব্ধি – গল্পের শুরুর বাক্যে এই জিনিস আমরা আগেও দেখেছি।  ভাবুন সেই অমর লাইন – ‘অস্বস্তিকর স্বপ্ন ভেঙে ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা দেখতে পেল সে একটা বিরাট পোকা হয়ে গেছে।’...  ১৯১৫ সালে প্রকাশিত ‘মেটামরফোসিস’ গল্পে ফ্রানৎস কাফকা দেখাচ্ছেন, নায়কের দুঃস্বপ্নকে ঘুমের দেওয়াল ফাটিয়ে কীভাবে তার দৈনন্দিন বাস্তবে চারিয়ে দেওয়া যায়। গ্রেগরের সকাল, যখন সূচনা তার অসুখের; ‘পোকা হয়ে যাওয়া’ – যা কিনা সমাজচ্যুত ঘৃণ্য ‘কিছু’ হয়ে যাওয়ার নিজস্ব আতঙ্ক। ...সন্দীপন ও মতি-র চরিত্রেরা গ্রেগরের মতোই অন্য কিছু হয়ে উঠেছে – পতঙ্গ গ্রেগরের তুল্য নিরুপায় উদ্বেগ (যাকে আমরা ‘কাফকায়েস্ক’ ব’লে চিনি) এরপর তাদের ভক্ষণ করে নেবে।   

১৯৬৭ সালে ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ লেখেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, তখনও-তরুণ কলার-তোলা গদ্যকার। নায়ক কুবের সাধুখাঁ, তাকেও লেখক একটি অসুখ উপহার দিচ্ছেন... ‘বাঁ হাতখানা মেলে ধরল কুবের।’ ...কালো কালো দাগগুলি সে নিজে দেখছে এবং দেখাচ্ছে এক সহযাত্রী ডাক্তারকে। তখনও সময় হচ্ছে সকাল; কুবের বেরিয়েছে নিজের জমিজমার কাজে। তার ধারণা - অসুখের বীজাণু অনেক আগেই বুনে দেওয়া ছিল। কৈশোরের একটি ‘গর্হিত’ কাজ– জনৈকা বেশ্যার সঙ্গে সঙ্গম – যার থেকে সে লাভ করেছে বিশেষ ধরনের ‘সিফিলিস’;  আক্রান্তের শরীর তা পুষে রাখে অনেক দিন, রোগের লক্ষণ ফুটে বেরোয় বহু দেরিতে। হাতের চামড়া কালো ও শক্ত হয়ে যাওয়া তারই চিহ্ন, আস্তে আস্তে ড্যামেজ হতে থাকবে স্নায়ুতন্ত্র। ‘ব্যাধি’ নিয়ে ভাবনাচিন্তায় ছিঁড়েখুঁড়ে যায় কুবের... লেখা যখন ফুরিয়ে আসছে তখন আমরা দেখব সে একটি অ-সামাজিক মনস্টারে পরিণত হয়েছে।    

আরও পড়ুন
নবজাগরণ থেকে বঙ্গভঙ্গ হয়ে রুশ বিপ্লব – বাঙালি সাহিত্যিকদের কলমে রাজনীতির ছায়া

যৌবনে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ‘দুঃখরোগ’ নামে গল্পটি লেখেন  (১৯৬৮ সালের ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল), যার অভিজ্ঞতা অনেকটাই নিজের জীবন থেকে নেওয়া। গল্পের নায়ক বাদল – এম-এ পাঠরত এক যুবক, যদিও অনেকক্ষণ হল ভোর হয়েছে এবং তার ঘুমও ভেঙে গেছে, বিছানা ছেড়ে উঠতে চায়নি। তার অসুখটি শরীরের নয় - মনের; বিপজ্জনক রকম ম্যানিয়াক ডিপ্রেশনে সে ভুগছে, যে অসুখকে অতীত কালে রোমান্টিকরা চিনতেন ‘মেলাংকোলিয়া’ বলে। এই গল্পেও দেখতে পাচ্ছি ‘সকাল’, ‘যুবক’ এবং ‘অসুখের শুরু’ – দিনের পর দিন যাবে, বাদল মাথাভর্তি বিষাদ নিয়ে বেঁচে থাকবে; তার কাল্পনিক বন্ধু সুধাবিন্দু কিংবা প্রেমিকা প্রীতিলতা (এও কাল্পনিক) তাদের মতোই সেও হয়ে যাবে অলীক জগতের উন্মাদ বাসিন্দা।       

গ্রেগর সামসা-র সংক্ষিপ্ত জীবন শেষ হয়েছিল অন্ধকার ঘরের নোংরা মেঝেয়, পোকা হিসেবে, আহত অবস্থায়। ...সন্দীপনের বিজন, সে জাগরণের চেয়েও বেশি আতঙ্কে জমে যাবে রাতের একটি দীর্ঘ স্বপ্নে; নিজের হেমাচুরিয়া নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে তাকে জানানো হবে ‘এ অতি কঠিন রোগ, এ রোগের কোনও চিকিৎসা হয় না তবু যেকোনো দিন এর ওষুধ বেরিয়ে যেতে পারে সেইজন্যে তাকে যতদিন সম্ভব বাঁচিয়ে রাখার জন্য ডাক্তার এখুনি তার চিকিৎসা শুরু করবেন। বিজনের ততদিন বেঁচে থাকা দরকার।’ ...মতি নন্দী-র তারক সিনহা, অতীতের এক ক্রিকেট ম্যাচে যে ছিল টুয়েলফথম্যান – তাড়া খেয়ে পালাতে পালাতে রাতের কলকাতা-কে জানবে চতুর্দিকে-ছড়াতে-থাকা একটি ‘ক্রিকেট-মাঠ’ হিসেবে, গলিতে-আটকে-পড়া তাকে ইঁট ছোঁড়া হলে সে আকুল হয়ে জানতে চাইবে, ‘কিন্তু কোথায় পালাব? প্যাভিলিয়নে!’ - অবশেষে তাকে ঢুকতে হয় এক দরিদ্র বেশ্যাপল্লিতে, ফিরতে হয় অসুখের উৎসে (তার গনোরিয়া এখনও সারেনি!) – পালাবার অন্য সব রাস্তাই যখন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।    

কুবের সাধুখাঁ, যে কিনা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়েরই ভোল-বদল – যে সিফিলিটিক, খুনি ও অর্ধোন্মাদ; গল্পের শেষে মাঝরাতে একটি মই বেয়ে উঠতে থাকে এবং অতিকায় চাঁদের আলো তাকে ক’রে তোলে নেশাতুর – সে আর মানুষ থাকে না বরং হয়ে যায় জন্তুর মতোই কামুক, উগ্র কেউ।  ... ‘দুঃখরোগ’-গ্রস্ত বাদল এম-এ পরীক্ষা দিতে গিয়ে একজন স্কিজোফ্রেনিকে পরিণত হয়, পরীক্ষার খাতায় সে উত্তরের বদলে লেখে একটানা ডিলিরিয়ম, চিৎকার জুড়লে তার মাথায় ঠাণ্ডা জল ঢালা হতে থাকে... ‘বাদল বাদলকে জল হয়ে গলে যেতে অনুভব করছে।... ‘আমার মাথায় কেন রে শালা, নিজেদের মাথায় ঢাল!’’ তার হ্যালুসিনেশন থামে না – অন্তহীন অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে কারা নামিয়ে নিয়ে যায় তাকে। 

আরও পড়ুন
মতি নন্দী, কলাবতীর ক্রিকেট ও একটি সত্যি-গ্রামের গল্প

স্বপ্নে যে-ভাঁটিখানা কিংবা যে ভাঁটিখানা-র স্বপ্ন আমি (এই নিবন্ধকার) প্রায়ই দেখি – তারই আবছা টেবিলে পানরত গ্রেগর, বিজন, তারক, কুবের ও বাদল মাথা নিচু ক’রে নিজেদের গোপন কথাবার্তা চালিয়ে যায়। অথবা, ওদের নাম... ফ্রানৎস, মতি, সন্দীপন, শীর্ষেন্দু কিংবা শ্যামলও হতে পারে। 

Powered by Froala Editor