ডিঙি নৌকায় আন্দামান পাড়ি, উত্তাল সমুদ্রকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়লেন বাঙালি অভিযাত্রী

যেদিকে চোখ যায়, কেবল জল আর জল। বঙ্গোপসাগরের ঢেউ কখনও শান্ত, কখনও তীব্র হয়ে ধেয়ে আসছে। তারই মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটি নৌকা। আরও ভালো করে বললে, একটি ছোট্ট সাধারণ ডিঙি নৌকা। গঙ্গার বুকে হামেশাই একে দেখা যায়। নৌকার ভেতর দুজন মানুষ দাঁড় বাইছেন। ওঁদের একজন আবার বাঙালি তরুণ! সালটা ১৯৬৯। দুজনে মিলে এই সাধারণ নৌকায় চড়েই বেরিয়ে পড়েছেন অসাধ্যসাধন করতে। গন্তব্য, সুদূর আন্দামান। ঢেউয়ের ধাক্কায় ওলোটপালট নৌকাটি; কিন্তু ওই দুই তরুণ হার মানবেন না।

আজ থেকে একান্ন বছর আগে এমনই একটি ঘটনার সাক্ষী ছিল বাংলা। পায়ের তলায় সর্ষে থাকলেও, বাঙালি জাতিটি নাকি বড়োই ভীতু! কোনো দুঃসাহসিক অভিযানে সে পা বাড়াবে না। বাড়িতে বসে, অফিসে গিয়ে নিশ্চিন্তে জীবন কাটাতেই নাকি এরা ভালোবাসে। এমন অপবাদের প্রত্যুত্তর বাঙালি দিয়েছে অনেক আগে থেকেই। একের পর এক শিখর পেরিয়েছে তাঁরা, তৈরি করেছে ইতিহাস। তাঁদের মধ্যেই অন্যতম ছিলেন পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। এখনকার বাঙালি কি মনে করতে পারবে এই নাম? বোধহয় না। কিন্তু একটা সময় এঁকে নিয়েই তৈরি হয়েছিল একটি ছড়া— ‘ঢেউয়ের তালে নৌকা দোলে ডিউক পিনাকী এগিয়ে চলে’। বাংলার মুখে মুখে ঘুরত এই ছড়া। আর এর পেছনেই রয়েছে এক দুঃসাহসিক অভিযান-বৃত্তান্ত; এবং বাঙালির সমুদ্র জয়… 

একদিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজির গবেষক, অন্যদিকে রোয়িং-এ চ্যাম্পিয়ন। পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের গণ্ডিটি অনেক বিস্তৃত। ১৯৬৯ সাল। তখন মাত্র ২৩ বছরের তরতাজা যুবক তিনি। আলাপ হল জর্জ অ্যালাবার্ট ডিউকের সঙ্গে। তিনি ছিলেন ভারতীয় নৌসেনার একজন অফিসার। আলাপ হতেই দেখা গেল, দুজনের পছন্দ একটি জায়গাতে এসে মেলে— সমুদ্র। দুজনের ভেতরেই সাহসের অফুরন্ত ভাণ্ডার। কথার সূত্রে হঠাৎই পিনাকী’র মাথায় খেলে যায় একটি অভিযানের পরিকল্পনা। কেমন হয়, যদি স্রেফ একটি ডিঙি নৌকায় চড়ে আন্দামানের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়া যায়? 

মাত্র দুই বছরের বড়ো ডিউক। বন্ধু’র এমন ভাবনায় সায় দিলেন তিনিও। আরেকজন ছিলেন উৎসাহ দেওয়ার জন্য। তিনি, মিহির সেন। কিংবদন্তি এই সাঁতারু ততদিনে প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেছেন। আরও বহু কৃতিত্ব তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে। তরুণ পিনাকী এবং ডিউকের এই অভিযানের কাজে এগিয়ে এলেন তিনি। নৌকাও ঠিক হয়ে গেল - পালহীন, কুড়ি ফুট লম্বা, পাঁচ ফুট চওড়া একটি নৌকা। আর নাম? এইবারেও এগিয়ে এলেন মিহির সেন। নৌকার নাম হোক ‘কানোজি আংরে’। ছত্রপতি শিবাজির নৌ-সেনাপতি তুকোজি আংরে’র ছেলে কানোজি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন। এবং একার হাতে তাঁদের প্রচুর জাহাজ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। পিনাকী-ডিউকের অভিযানও তো এমন বীরত্বেরই প্রতীক। মনে রাখতে হবে, ষাটের দশকে প্রযুক্তি ও সমুদ্রযাত্রা আজকের মতো সহজ ছিল না। তার ওপর এমন নৌকায় যাত্রা করা হবে, যেটা একেবারেই সমুদ্রের দুর্গম অভিযানের সঙ্গে মানানসই নয়। কিন্তু ভয়কে জয় না করলে, মজাটা কোথায়?

১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯। কলকাতার ম্যান অফ ওয়ার জেটি থেকে যাত্রা শুরু হল ‘কানোজি আংরে’র। ভেতরে পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় এবং জর্জ অ্যালবার্ট ডিউক। নকশা প্রস্তুত, গন্তব্য স্থির। দীর্ঘ পথে রয়েছে অনেক বাধা বিপত্তি। কিন্তু হার মানার জন্য তো জলে নামেননি পিনাকী। গোটা বাংলা তাঁর দিকে চেয়ে আছে। চেয়ে আছেন মিহির সেন। দাঁড় টানা শুরু হল। প্রথমদিকে সবকিছুই ছিল ঠিকঠাক। বেতারের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগও করছিলেন তাঁরা। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হল গণ্ডগোল। হঠাৎ করেই বেতার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ‘কানোজি আংরে’র সঙ্গে। আর তখন এই মাধ্যম ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বস্তুত, বিস্তীর্ণ বঙ্গোপসাগরে একপ্রকার ‘নিখোঁজ’ই হয়ে গেলেন পিনাকী-ডিউক। কোথায় তাঁরা, আদৌ সুস্থ আছেন তো? সেই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী যারা, তাঁরা প্রত্যেকেই মনে করতে পারবেন সেই মুহূর্তটা। সব জায়গায় প্রার্থনা চলছে, পিনাকীদের যেন কোনো বিপদ-আপদ না হয়। ওঁদের রক্ষা কোরো, ঠাকুর… 

আকাশে উড়ল বিশেষ বিমান। ছোটো ছোটো বৃত্তে ভাগ করে গোটা বঙ্গোপসাগর তছনছ করে ফেলা হল। কোথায় কানোজি আংরে? কন্ট্রোলরুম থেকে বারবার খবর জানতে চাওয়া হচ্ছে। এদিকে বিমানের পাইলটের কাছে একটাই উত্তর- ‘নেগেটিভ’। একদিন, দুদিন, তিনদিন… প্লেন একবার উড়ছে; দিন-রাত এক করে খোঁজার পর হতাশ হয়ে ফিরে আসছে। কোথাও কি কোনো আশা আছে? এমন সময় সমুদ্রের বুকে দেখা মিলল একটি বিন্দুর। তাহলে কি…? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন পাইলট। কাছে যেতেই দেখলেন, ছোট্ট ‘কানোজি আংরে’র ওপর বসে দাঁড় টানছেন পিনাকী আর ডিউক। ধড়ে প্রাণ ফিরে এল সবার। গোটা অভিযানে আরও দুবার নিখোঁজ হয়েছিলেন তাঁরা। একবার তো ভয়ংকর ভূমিকম্পের সামনে পড়ল নৌকাটি। শান্ত সমুদ্র এক লহমায় রাক্ষসে পরিণত হল। এমন পরিস্থিতিতে বড়ো বড়ো জাহাজও দিশা হারিয়ে ফেলে; ‘কানোজি আংরে’ তো পুতুলমাত্র! কোমরে দড়ি বেঁধে চলল রাত্রিজাগরণ। 

আরও পড়ুন
খড়ের নৌকোয় বহরমপুর থেকে কলকাতা, দুঃসাহসিক অভিযান ১০ বাঙালির

বেঁচে তো গেলেন পিনাকী-ডিউক; কিন্তু মাশুল দিতে হল নানাভাবে। নৌকার বেশ কিছুটা ক্ষতি হয় সেই দুর্যোগে। উপরন্তু, পিনাকী চট্টোপাধ্যায় নিজে ভয়ংকরভাবে জখম হন। ডান হাতের আটটা লিগামেন্ট যায় ছিঁড়ে। ডিউক আক্রান্ত হন হার্নিয়ায়। তবুও দমবার পাত্র নন কেউ। ডান হাত কাজ করছে না তো কি হয়েছে, বাঁ হাত আছে! এক হাতেই দাঁড় টানতে শুরু করলেন পিনাকী। এ যে কি দুরূহ কাজ, যে করেছে সে-ই জানে। আর এমন কষ্ট সহ্য করেন যারা, তাঁদের জন্য সহায় হন সবাই। ৮ মার্চে এল সেই মুহূর্ত। পোর্ট ব্লেয়ারের মাটি ছুঁল কানোজি আংরে। কলকাতায় খবর পৌঁছনো মাত্র তুমুল হইহল্লা। এভাবে সমুদ্রকে শাসন করতে তাহলে বাঙালিরাও পারে! 

ফিরে এসে কলকাতায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেছিলেন পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। অভিযাত্রী সত্তা তাঁর ভেতর ঢুকে গেছে। যদি এইভাবে ইন্দোনেশিয়ার দিকেও যাওয়া যায়? মুশকিল, কিন্তু অসম্ভব তো নয়! কিন্তু কে জানত, আর কোনো অভিযানে নামতে পারবেন না পিনাকী চট্টোপাধ্যায়। যে জল তাঁকে সঙ্গী করে নিয়েছিল, সেই জলেই ঘনিয়ে এল মৃত্যু। মাত্র ৩৭ বছরের যুবক তিনি। তাঁর মৃত্যু আজও মানতে পারেন না অনেকে। এত ভালো সাঁতার জানতেন যিনি, তিনি কী করে ডুবে মারা গেলেন? রহস্যেই শেষ হল জীবন। আর আমরা? পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের মতো ‘ব্যতিক্রমী’ বাঙালি কি ব্রাত্যই হয়ে রইলেন আমাদের কাছে? 

তথ্যসূত্র-
১) ‘কানোজি আংরে’, চিরঞ্জীব, আনন্দবাজার পত্রিকা 

আরও পড়ুন
শসার খোসা থেকে প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরির দিশা দেখাচ্ছেন বাঙালি গবেষক

Powered by Froala Editor

More From Author See More