নিজের কবিতার বইয়ের বিজ্ঞাপন লিখলেন বঙ্কিমচন্দ্র, সেই প্রথম গদ্য লেখা তাঁর

কাগজের পাতায় থাকা সামান্য একটি বিজ্ঞাপন। রোজ এরকম কত জিনিসই না আমাদের চোখের সামনে আসে। বিজ্ঞাপনের পাতা একবার চোখ বুলিয়ে, কখনও না বুলিয়েই অন্য খবরে চলে যাই আমরা। আগেকার সংবাদপত্রেও বিজ্ঞাপন ছাপা হত অবশ্যই। মাঝে মাঝে খুঁটিয়ে পড়া হত, কখনও হত না। কিন্তু হঠাৎ আপনার চোখে সামনে একটি কবিতার বই বিক্রির বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। খানিক ঘাবড়ে যাবেন, আমোদ পাবেন। বাংলা কবিতার অবস্থা নিয়ে খানিক বিশ্লেষণ করবেন। কিন্তু যদি জানতে পারেন, বিজ্ঞাপনদাতার নাম শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়?

খানিক ঘাবড়ে গেলেন তো এবার! বাংলা সাহিত্যের গদ্য সম্রাটের কবিতা! তার জন্য বিজ্ঞাপন! এখন নিশ্চয়ই একে আর অবহেলা করবেন না। এমনটা বাস্তবে যখন হয়েছিল, তখন বঙ্কিম সদ্য কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছেন। আর এই বিজ্ঞাপনই ছিল তাঁর লেখা প্রথম প্রামাণ্য গদ্য। হ্যাঁ, গদ্য সম্রাটের লেখা প্রথম গদ্যটি কোনো গল্প নয়, একটি বিজ্ঞাপন!

ছোটবেলা থেকে কুইজে একটা প্রশ্ন মোটামুটি এক থাকত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা প্রথম বইটি কী? উত্তর আসবে ‘দুর্গেশনন্দিনী’। উত্তরটায় ছোট্ট একটু ভুল আছে। প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’; প্রথম বই নহে। সাধারণত যার হাত ধরে অধিকাংশের যাত্রা শুরু হয়, বঙ্কিমের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। অর্থাৎ, কবিতা! মাত্র ১৮ বছর বয়সে তরুণ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম কবিতার বই বেরোয়, নাম ‘ললিতা’। শিরোনামের নিচে লেখা, ‘পুরাকালিক গল্প। তথা মানস।’

সংস্কৃত ভাষাটির প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের আকর্ষণ ছিল বরাবর। তাঁর গল্প, উপন্যাস পড়লে ভালোভাবে জানা যায় সেটা। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি তিনি। ইংরেজি সাহিত্যের জগতেও তাঁর প্রবেশ ঘটে। সেই সমুদ্রেই তিনি অনুসন্ধান করতে থাকেন সাহিত্যের। বঙ্কিমকে এই দিকে নিয়ে যান হুগলি কলেজের অধ্যাপক ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। যাই হোক, এভাবেই সাহিত্য সাধনা করতে থাকেন। সেই সঙ্গে নিজের মধ্যেও চর্চা করতে থাকেন কবিতার। তারই ফলস্বরূপ, ১৮৫৩ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই লিখে ফেলেন কয়েকটি কবিতা। একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়। সেটিই তিন বছর পর, ১৮৫৬ সালে প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমের প্রকাশিত প্রথম বই, কবিতার বই।

কিন্তু প্রথম গদ্যের কথাটি? বইটি বেরনোর পর সংবাদ প্রভাকরে নিজেই একটি বিজ্ঞাপন লেখেন বছর আঠেরোর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সেখানে লিখেছিলেন— “সু কাব্যালোচকমাত্রেরই অত্র কবিতাদ্বয় পাঠে প্রতীতি জন্মিবেক যে ইহা বঙ্গীয় কাব্য রচনা রীতি পরিবর্তনের এক পরীক্ষা বলিলে বলা যায়। তাহাতে গ্রন্থকার কতদূর সুত্তীর্ণ হইয়াছেন তাহা পাঠক মহাশয়েরা বিবেচনা করিবেন। তিন বৎসর পূর্বে এই গ্রন্থ রচনা কালে গ্রন্থকার জানিতে পারেন যে তিনি নূতন পদ্ধতির পরীক্ষা পদবিরূঢ় হইয়াছেন। এবং তৎকালে স্বীয় মানস মাত্র রঞ্জনাভিলাষজনিত এই কাব্যদ্বয়কে সাধারণ সমীপবর্তী করিবার কোন কল্পনা ছিল না কিন্তু কতিপয় সুরসজ্ঞ বন্ধুর মনোনীত হইবার তাহাদিগের অনুরোধানুসারে এক্ষনে জন সমাজে প্রকাশিত হইল। গ্রন্থকার স্বকর্ম্মার্জ্জিত ফলভোগে অস্বীকার নহেন কিন্তু অপেক্ষাকৃত নবীন বয়সের অজ্ঞতা ও অবিবেচনা জনিত তাবৎ লিপিদোষের এক্ষনে দণ্ড লইত প্রস্তুত নহেন।”

আজকের পাঠক এক ঝলক পড়েই বুঝে যাবেন এটি কার লেখা। কিন্তু আজ থেকে অত বছর আগে অমন গদ্য রীতি বেশ নতুনই ছিল। ওই বইটি বিক্রি হয়নি সেরকম। পরে বঙ্কিম স্বীকারও করেন সেই কথা। কিন্তু ততদিনে বাংলা সাহিত্য চিনে নিয়েছে তাঁর গদ্য সম্রাটকে। তাঁর উপন্যাসের অত কপি বিক্রি হয়! কিন্তু প্রথম সেই দিনের কথা কি কেউ ভুলতে পারে! বঙ্কিম কি পেরেছিলেন মনে রাখতে তাঁর প্রথম গদ্যটির কথা? যেটা সংবাদপত্রের পাতায় অনেক বিজ্ঞাপনের মধ্যে ঝলসে উঠেছিল? ইতিহাস সেটাকে সযত্নে ধরে রেখেছে।

ঋণ-
১) ‘বঙ্কিম প্রসঙ্গ’, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি
২) আজকাল, ২০১৮, ‘বঙ্কিমের প্রথম বই ‘বিক্রয় হয় নাই’’

Powered by Froala Editor

More From Author See More