রুশ ভাষা আগ্রাসনেরও শিকার ইউক্রেন, ঘনাচ্ছে তর্ক

গত ফেব্রুয়ারি মাসেই ইউক্রেনের ওপর সামরিক আক্রমণ চালিয়েছিল রাশিয়া। তারপর থেকে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক ইউক্রেনিয়ান ঘরছাড়া। যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রাণ কেড়েছে বহু মানুষের। কিন্তু ইউক্রেনের ওপর এই আক্রমণের ঠিক আগেই দুই দেশের ভাষাগত ‘ঐতিহাসিক ঐক্য’ নিয়ে দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আর এই বক্তৃতাই এবার ভাইরাল হয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে পশ্চিমী দুনিয়ায়। ইউক্রেনের অধিকাংশ মানুষেরই অভিমত, শুধু যুদ্ধ বা রাজনৈতিক ক্ষমতাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে রুশ ভাষা আগ্রাসনেরও শিকার ইউক্রেন (Ukraine)। 

সাম্প্রতিক সময়ের যুদ্ধ পরস্থিতিতে, সংবাদমাধ্যমে বার বার উঠে এসেছে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ শহরের কথা। এই শহরের নামের ইতিহাসই ধরে নেওয়া যেতে পারে তার উদাহরণ হিসাবে। মূলত, ‘কিয়েভ’ (Kiev) কথাটি রাশিয়ান অনুকরণ। ইউক্রেনিয়ান ভাষায় শহরটির নাম বা উচ্চারণ ‘কিভ’ (Kyiv)। তবে সোভিয়েত আমল থেকে রুশ ভাষার উচ্চারণের অনুকরণে শহরটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় ‘কিয়েভ’ হিসাবে।

দেখতে গেলে, ইউক্রেনিয়ান এবং রুশ— উভয় ভাষারই জন্ম হয়েছে স্লাভোনিক ভাষা পরিবার থেকে। পোল্যান্ড, চেক, বুলগেরিয়ান-সহ মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপের একাধিক দেশেই দেখা মেলে এই ভাষা পরিবারের। রুশ এবং ইউক্রেনিয়ান ভাষাও এই ভাষা পরিবারেরই অংশ। প্রায় হাজার বছর আগে স্লাভোনিক গোষ্ঠীর পৃথক পৃথক উপভাষা থেকে জন্ম হয়েছিল দুটি ভাষার। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ বাড়তে থাকে ব্যাকরণগত ও উচ্চারণগত পার্থক্য। 

অষ্টাদশ শতকে রাশিয়া ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ লাভ করার পর, শুরু হয় ভাষাদ্বন্দ্ব। রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং প্রভাবই যেন অদৃশ্য কোনো ব্যারিকেড তুলে দিয়েছিল রুশ ও ইউক্রেনিয়ান বক্তাদের মধ্যে। অলিখিতভাবে ইউক্রেনের মানুষদের ওপর একপ্রকার জোর করেই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল রুশ ভাষা। জারের আমল তো বটেই, পরবর্তী সময়েও ইউক্রেনিয়ান ভাষাকে অবদমিত করে রেখেছিল সোভিয়েত প্রশাসন। সে-সময় উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবেই রুশ ভাষাকে বেছে নিতে হয়েছে ইউক্রেনিয়ানদের। ইতিহাসের এই ধারা মেনেই আজ ইউক্রেনের ৩৫ শতাংশ মানুষের কথ্য ভাষা রাশিয়ান। 

আরও পড়ুন
মৃত্যু বনাম ভাগ্যের দ্বৈরথ, কীভাবে জন্ম হয়েছিল রাশিয়ান রুলেটের?

যদিও সোভিয়েত ভাঙার পর থেকেই শুরু হয়েছিল ইউক্রেনিয়ান ভাষার শৃঙ্খলমুক্তির লড়াই। দুই দেশের শব্দভাণ্ডারে ৬২ শতাংশ শব্দের মিল থাকলেও, দুই ভাষার মধ্যে বৈসাদৃশ্য তৈরি করে দেয় মূলত ৪টি করে অক্ষরের উপস্থিতি এবং তাদের উচ্চারণ। স্বাধীনরাষ্ট্র হওয়ার পর ইউক্রেনিয়ান বর্ণমালার এই চারটি অক্ষরকে আবার ফিরিয়ে আনা হয় স্থানীয় কথ্য উচ্চারণে। সেই ধারা মেনেই ‘কিয়েভ’ থেকে ‘কিভ’। যার মধ্যে শুধু ভাষার ইতিহাসই নয়, লুকিয়ে রয়েছে গভীর দেশপ্রেমও। সেই জায়গা থেকেই, পুতিনের সাম্প্রতিক ‘ভাষাগত ঐক্য’-এর তত্ত্বকে খণ্ডন করে আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন ইউক্রেনিয়ানরা…

আরও পড়ুন
রাশিয়ান তেলে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ, বিশ্বজুড়ে বাড়তে পারে পেট্রোপণ্যের দাম

Powered by Froala Editor

আরও পড়ুন
রাশিয়ার আক্রমণে অগ্নিগদ্ধ ইউক্রেনের পারমাণবিক কেন্দ্র, ‘চের্নোবিল’ পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা

More From Author See More

Latest News See More