কর্মীঘাটতি, অতিরিক্ত কর্মসময়, পরিকাঠামোর অভাব— রেল দুর্ঘটনা ও নেপথ্য-কারণগুলি

শুক্রবার দুপুরে শালিমার থেকে চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিল করমণ্ডল এক্সপ্রেস। তবে পৌঁছানো হল না গন্তব্যে। যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, সন্ধে ৭টা বেজে ২০ মিনিট নাগাদ ওড়িশার বালেশ্বর জেলায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয় চেন্নাইগামী সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসটি। লাইনচ্যুত হয় বেশ কয়েকটি বগি। রেল থেকে ছিটকে যাওয়া কামরাগুলির সঙ্গে সংঘর্ষ হয় পাশের লাইন দিয়ে ছুটে চলা মালগাড়ি ও হাওড়াগামী যশোবন্তপুর সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের। সংঘর্ষে তালগোল পাকিয়ে যায় তিনটি ট্রেনের বগি। 

গতকালের এই বিধ্বংসী দুর্ঘটনা ইতিমধ্যেই প্রাণ কেড়েছে ২৬১ জনের। আহতের সংখ্যা ৯০০-রও বেশি। যাঁদের মধ্যে অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন আশঙ্কাজনক অবস্থায়। এছাড়াও রেল কামরার মধ্যে বন্দি হয়ে রয়েছেন বহু মানুষ, আশঙ্কা উদ্ধারকর্মীদের। কিন্তু কী কারণে ঘটে গেল এই বড়ো দুর্ঘটনা? 

করমণ্ডল এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার (Rail Collision) ছবি ঘিরেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। প্রথমত, করমণ্ডল এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন উঠে গিয়েছিল মালগাড়ির দুটি বগির ঠিক উপরে। ঠিক যেন কেউ ক্রেনে করে মালগাড়ির ওপরে বসিয়ে দিয়েছে এই ইঞ্জিনটিকে। একাংশের অনুমান, মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলেই একমাত্র ঘটতে পারে এইধরনের দুর্ঘটনা। তবে রেল কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী এক্ষেত্রে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়নি ট্রেনের। বরং, সংঘর্ষ হয়েছিল পাশাপাশি। করমণ্ডলের লাইনচ্যুত বগির সঙ্গেই সংঘর্ষ হয় মালগাড়ি ও দ্বিতীয় ট্রেনটির। ফলে, দুর্ঘটনার সময় ঠিক কী ঘটনা ঘটেছিল, তা এখনও অস্পষ্ট সকলের কাছেই। 

যদিও রেলের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, করমণ্ডল এক্সপ্রেসকে প্রাথমিকভাবে সিগন্যাল দেওয়া হয়েছিল এগিয়ে যাওয়ার জন্য। তবে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তুলে নেওয়া হয় সিগন্যাল। ঠিক কী কারণে সিগন্যাল তুলে নেওয়া হয়েছিল— এখনও পর্যন্ত অজানা সেটিও। তা নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলেই দাবি করছে রেল কর্তৃপক্ষ। 

তবে শুধুই কি সিগন্যালিং-এর সমস্যা? বালেশ্বর রেল দুর্ঘটনাকে ঘিরে উঠে আসছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভারতীয় রেলের পরিষেবা ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২-২৩ সালে দেশজুড়ে মোট রেল দুর্ঘটনা বা লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে ১৬২টি। যার মধ্যে ৪৮টি ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রবল। বাকিক্ষেত্রগুলিতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। অন্যদিকে ২০২১-২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৫। অর্থাৎ, প্রায় ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনার সংখ্যা। 

রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৬২টির মধ্যে ৩৫টি ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে সিগন্যালিং-এর সমস্যা। তাছাড়া জনবলের তীব্র ঘাটতিও রয়েছে রেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণের তালিকায়। রেলওয়ে বোর্ড জেনারেল ম্যানেজারদের উচ্চ-স্তরের বৈঠকে একাধিকবার এর আগে উল্লেখিত হয়েছে এই পরিস্থিতির কথা। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই রেলওয়ে লোকোপাইলটদের কর্মসময় ১২ ঘণ্টার বেশি হতে পারে না। তবে লোকবলের অভাবের কারণে অনেকক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করতে হয় রেলচালকদের। 

শুধু লোকোপাইলটই নয়, একই ঘটনা ঘটে চলেছে রেলের অন্যান্য ক্রুদের সঙ্গেও। রিপোর্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব, দক্ষিণ ও মধ্য রেলওয়েতে মার্চ, এপ্রিল এবং মে মাসে সবমিলিয়ে ১২ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হয়েছে যথাক্রমে ৩৬, ৩৪ এবং ৩৩ শতাংশ ক্রু-মেম্বার অর্থাৎ কর্মীদের। যা যাত্রী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আশঙ্কাজনক বলেই দাবি উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের। অথচ, থমকে রয়েছে শূন্যপদ ভর্তি করার জন্য নিয়োগের প্রক্রিয়া। এমনকি গত মাসে দক্ষিণ রেলওয়ের অল ইন্ডিয়া লোকো পাইলট রানিং স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছিল, বিভিন্ন বিভাগে লোকোপাইল্ট পদে ৩৯২টি শূন্যপদ রয়েছে। 

এ-তো গেল জনবলের প্রসঙ্গ। এবার ফিরে আসা যাক পরিকাঠামোয়। বিগত কয়েক বছরে ভারতীয় রেলে একাধিক নতুন পরিষেবা ও প্রযুক্তি চালু করা হলেও, তা এখনও পর্যন্ত গোটা দেশের রেলপথে স্থাপন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যার মধ্যে অন্যতম দুটি প্রযুক্তি হল কবচ এবং অটোমেটিক রেল ফ্র্যাকচার ডিটেকশন সুইস টেকনোলজি। 

গতবছরই স্বদেশি প্রযুক্তি ‘কবচ’ সিস্টেমটির উদ্বোধন করেন রেলমন্ত্রী। সফল পরীক্ষণের সময় স্বয়ং যাত্রীর আসনেও ছিলেন তিনি। তবে উদ্বোধন পর বেশ কয়েক মাস কেটে গেলেও, এখনও পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি লাইনেই কেবলমাত্র চালু রয়েছে এই সিস্টেম। যা একই লাইনে দুটি ট্রেন চলে এলে, সতর্ক করে লোকোপাইলটদের। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে কমাতে থাকে দুটি রেলইঞ্জিনের গতিই। গতকাল দুর্ঘটনার শিকার হওয়া দুটি ট্রেনেই এই প্রযুক্তি ছিল না। পাশাপাশি সুইস টেকনোলজিটি বর্তমানে বিদ্যমান কেবলমাত্র কঙ্কন-গোয়া রেলওয়ে লাইনে। যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করে রেল লাইনে ফাটল দেখা দিয়েছে কিনা। বর্তমানে এই প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়ে পড়ছে গোটা দেশজুড়েই। ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফাটল দেখা দিচ্ছে রেল ট্র্যাকে। শীতকালে উত্তর ভারত এবং গ্রীষ্মে দক্ষিণ ভারতে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করা গেছে সবচেয়ে বেশি। অথচ, এখনও পর্যন্ত এই অধিকাংশক্ষেত্রেই রেল ট্র্যাক পরীক্ষা করা হয় ম্যানুয়ালি। 

ফলে সার্বিকভাবে দেখতে গেলে, বাহ্যিক দিক থেকে চমকপ্রদ হয়ে উঠলেও, প্রশ্ন উঠছে ভারতীয় রেলের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। ভারতের অন্যতম যোগাযোগের মাধ্যম রেল। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন দেশের ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ রেলসফর করেন। সবমিলিয়ে দেশে ১৪ হাজার রেল চলে প্রতিদিন। ফলে, বলার অপেক্ষা থাকে না, রেলের এই অপ্রতুল পরিকাঠামো রীতিমতো আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে যাত্রী নিরাপত্তার নিরিখে।

Powered by Froala Editor