অভিমান বুকে নিয়েই অকালপ্রয়াণ আরডি-র, মৃত্যুর পর পেয়েছিলেন ফিল্মফেয়ার

১৯৯৪ সালের ৩ জানুয়ারি। যেদিন ওঁর মুম্বইয়ের ফ্ল্যাটে নিঃসঙ্গ রাহুল দেব বর্মন বুকে অনেক ব্যথা নিয়ে মারা গেলেন। শরীরে তো বটেই, প্রচুর ব্যথা জমেছিল মনেও। অর্থকষ্টে ছিলেন প্রবল। তবু একা একাই লন্ডনে গিয়ে হার্ট সার্জারি করিয়ে এসেছিলেন বাধ্য হয়েই। একদিন আশা ভোঁসলে দেখতে এসেছেন দেখে বিহ্বল হয়ে বলেছিলেন, “জানতাম তুমি আসবে।”  উত্তরে শুনতে হ'ল, আশা আমেরিকায় শো করতে যাওয়ার পথে খানিকটা যেন ভদ্রতা রক্ষা করেছেন মাত্র।

তাঁর সুর দেওয়া ছবি একের পর এক ফ্লপ করে যাচ্ছে তখন। অপয়া বলেও তকমা নিতে হচ্ছে।একসময়ের কাছের বন্ধু কিংবা মোসাহেবরাও আর তাঁর পাশে নেই। বিধুবিনোদ চোপড়া তাঁকে ডাকলেন '১৯৪২ আ লাভ স্টোরি'র জন্য। তাঁর হাতদুটো ধরে রাহুল বলেছিলেন 'কাজটা আমি করছি তো'? নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেননি বিধুবিনোদ। 

খারের ফ্ল্যাটে তখন একাই থাকেন আরডি। কাজের লোক এসে ঘর পরিষ্কার , রান্নাবান্না  সময়মতো করে দেয়। তিনি নিজে সারাদিন ডুবে থাকেন সঙ্গীতে। 

একদিন  তাঁর এক কাছের মানুষ  এসেছেন। মিউজিক রুমের দরজা ঠেলে ঢুকতেই শুনলেন তীব্র গালাগালি। অভ্যস্ত  ভদ্রলোক কিন্তু বুঝে ফেললেন আরডি।  তখন আর্কিমিডিস । বাজি ফেলা যায় যে তখন তিনি দারুণ কোনো সুর পেয়ে গেছেন।   তারপর বললেন, ওরা  বুঝবে বুঝলি! ছবিটা একবার শুধু রিলিজ হতে দে না! বুঝবে কাকে ওরা হেলাফেলা করেছিল। সবার এক্কেবারে  বারোটা বাজিয়ে তবে ছাড়ব !

কুমার শানুও একদিন তাঁর সুরে রেকর্ড করে বেরিয়ে গালিগালাজ শুনে ভয় পেয়ে গেছিলেন। ভেবেছিলেন নিশ্চয়ই কাজ খুব খারাপ হয়েছে। কিন্তু পঞ্চমদার পরিচিতরা বলেছিলেন তাঁর গালাগালি মানে বুঝতে হবে দারুণ কাজ হয়েছে!

তীব্র অনটন কুরে কুরে খাচ্ছে পঞ্চমের দেহ-মনকে। বদলে যাওয়া নিষ্ঠুর সময়ের সঙ্গে এক নীরব লড়াই চলছে। গায়ক অভিজিৎ ভট্টাচার্যকে ব্রেক দিয়েছিলেন রাহুলই। স্ট্রাগল পিরিয়ডে কাজের আশায় রোজ রাহুলের কাছে যখন তিনি যেতেন। দুঃখের সঙ্গে পঞ্চম বলেছিলেন - অভিজিৎ, তুমি কাজের জন্য আমার কাছে আসো, আমার নিজের হাতেই কাজ নেই।       

আরও পড়ুন
‘বিবিধ গানে’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় যদি নিজেকে আরও একটু বেশি করে দিতেন!

আটের দশক। রুপোলি পর্দায় রাজেশ খান্না সরে গেছেন। আছেন অ্যাংরি ইয়ং ম্যান অমিতাভ বচ্চন আর ডিস্কো ডান্সার মিঠুন। বচ্চনও প্রায় অস্তে।বলিউড তখন মিঠুনময়।  বাপি লাহিড়ীর বাজার প্রায় উপচে পড়ছে। কাজ কমে এল আরডি-র।না জানা চোরাপথে কাজ চলে যাচ্ছে অল্পখ্যাত, মধ্যম মানের নতুনদের কাছে।এমনকি তাঁকে কাজ দিয়েও মাঝপথে নিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্যদের।

পর্দায় তখন আধিপত্য দাপুটে নায়কের, তাঁকে ঘিরেই  অন্যান্যরা। প্রেম, বিরহ, রাগ, প্রতিহিংসা সবকিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণে। প্রযোজকরা অত বেশি খরচা করছেন না সুরের পেছনে । গান আর তার শিল্প নিয়ে মাথাব্যথাও নেই। ছবির ভাষা এমনকি 'বাজার' ও বদলাচ্ছে।

অতএব দরকার ফুরিয়েছে আরডি বর্মনের মেলোডির। রিদমের। অনেকে বলেন বাপি লাহিড়ীর উপর রাগ নাকি বেশ স্পষ্ট ছিল আরডি-র। ঘনিষ্ঠমহলে তাঁকে ব্যঙ্গ করে ডাকতেন ‘উল্লাসনগর কি আরডি বর্মন’ বলে। 

আরও পড়ুন
‘নিগার্স’ বদলে ‘ডার্কি’ ব্যবহার করলেন পল রোবসন, কালো মানুষের গান আছড়ে পড়ল সারা বিশ্বে

এই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মূলে নাকি এক মজার ঘটনা। আশা ভোঁসলেকে দিয়ে একবার গান গাওয়াচ্ছেন বাপি লাহিড়ী।  সুর শুনে অবাক হয়ে আশা ভোঁসলে বলেছিলেন , ‘‘ইয়ে গানা তো ম্যায়নে কুছ সাত-আট সাল পহলে রেকর্ডিং কিয়া থা, আরডিকে লিয়ে।’’...

শোনা যায়  মুম্বইয়ের কাছেই উল্লাসনগরে তখন পাইরেটেড বিদেশি গানের ভিডিও আর অডিও ক্যাসেট পাওয়া যেত। লোকে বলত লুকিয়ে বিক্রি হওয়া সেসব ক্যাসেটের অন্যতম ওজনদার  ক্রেতা নাকি ছিলেন বাপি লাহিড়ী।  এক কার্টুনিস্ট অবধি সেই সময়ে এক ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছিলেন, মাথায় বোঝাই করা ক্যাসেট নিয়ে আরডি চলেছেন আর তাঁর ঝুড়ি থেকে পড়ে যাওয়া ক্যাসেট দু'হাতে কুড়িয়ে নিচ্ছেন বাপি লাহিড়ী!

একসময় যে প্রোডিউসাররা রাহুলের দোরে দোরে ঘুরতেন, তাঁরা এখন লাইন দিচ্ছেন বাপি লাহিড়ীর কাছে৷ কোনো প্রস্তাব বাপি না নিলে ঠেকায় পড়ে তখন তাঁরা যাচ্ছেন আর ডি র কাছে। নামমাত্র পারিশ্রমিকে অসম্ভব পরিশ্রম করে ভালো মিউজিক করতে বাধ্য হচ্ছেন আর ডি।

আরও পড়ুন
কৃষ্ণের হোলি খেলা নিয়ে গান লিখলেন নজরুল, রেকর্ডে কণ্ঠ মহম্মদ রফির

নিজের ভালো সময়ে আগে তাঁর কাজের হিসেব থাকত না, এখন তিনিও গুনতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁর সুর করা ফ্লপ ছবির সংখ্যা ২৯।

'৯৪-এর ৩ জানুয়ারিতে ছবির ক্লাইম্যাক্স নিয়ে উত্তেজনায় সারা সন্ধে ছিল ভরপুর। প্রোডিউসার ডিরেক্টরের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা ধরে মিটিং। বহুদিন কোনো সাফল্য আসেনি। সুযোগ পেলে আবার একটা কিছু করা যাবে। আরডি জানেন তিনি পারবেন।

মিটিং শেষ করে তিনি বেরিয়ে গেলেন সান্তাক্রুজে শক্তি সামন্তের বাড়িতে ডিনারের নেমন্তন্নে। সব পুরনো বন্ধুই ছেড়ে যায়নি তখনও। বন্ধু শক্তিকে বললেন - 'ছবিটা শুধু একবার মুক্তি পেতে দিন, দেখবেন আবার বাজার জমিয়ে দেব।'

সাড়ে বারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরলেন তিনি। দারোয়ানকে পঞ্চাশ টাকা বকশিস দিলেন গাড়িটা একটু পার্ক করে দেওয়ার জন্যে, কারণ শরীরটা ঠিক লাগছিল না। ডাক্তারের নিষেধ অগ্রাহ্য করে নিজেই টানা ড্রাইভ করেছিলেন।  রোজকার মতো ঘরের ৪০ ইঞ্চি টিভিটায় বিবিসি দেখতেও বসলেন। কিন্তু শরীরটা হঠাৎ অস্বস্তি জানান দিল। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বুঝলেন লক্ষণ ভালো নয়। কাউকে ডাকতেই হবে । রাত আড়াইটায় ঘরের বেলটা বেজে উঠতেই ছুটে এল কাজের লোকেরা। তারা দেখলো তিনি শুয়ে আছেন, জিভ বেরিয়ে গেছে । কাজের লোক সুদাম চটপট মুখে সরবিট্রেট স্প্রে করে দিলেন,তাঁকে আগে থেকে ট্রেনিং দিয়েই রাখা ছিল। ড্রাইভার রমেশ তড়িঘড়ি  অ্যাম্বুল্যান্স ডাকলেন। সেক্রেটারি ভারত একজন ডাক্তারও নিয়ে এলেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে কার্ডিয়াক ম্যাসাজ করলেন। অ্যাম্বুল্যান্স এসে গেল তিনটে চল্লিশে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। 

শক্তি সামন্ত রাহুলের ড্রাইভারের ফোন পেলেন - ' বাবুসাব গুজর গয়ি।'

বহুবছর পর ‘Harry Potter and the Prisoner of Azkaban’ ছবির ডিরেক্টর Alfonso Cuarón  স্বীকার করবেন— তাঁর শোনা শ্রেষ্ঠ মিউজিক্যাল ছবি ‘১৯৪২— আ লাভ স্টোরি’। কেনই বা তা হবে না! এই সিনেমার গান সাড়া ফেলেছিল সর্বত্র। মরণোত্তর ফিল্মফেয়ারও পেলেন আরডি। সবাই অবাক হয়ে দেখল, এ এক অদ্ভুত পঞ্চম। ফিনিক্স পঞ্চম। মৃত্যুর পরেও যাঁর জ্বলে ওঠা অবশ্যম্ভাবী...

তথ্যঋণ -
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য - আনন্দবাজার পত্রিকা
শর্মিলা মাইতি - এবেলা
রাহুল দেববর্মন সংখ্যা - আনন্দলোক
রাহুল দেববর্মন- প্রবীর মিত্র
অভীক মন্ডল - আনন্দবাজার পত্রিকা
কুণাল বিশ্বাস - মহানগর ২৪/৭ ওয়েব পোর্টাল

Powered by Froala Editor

More From Author See More