‘নিগার্স’ বদলে ‘ডার্কি’ ব্যবহার করলেন পল রোবসন, কালো মানুষের গান আছড়ে পড়ল সারা বিশ্বে

“সহস্র বরষার উন্মাদনার,
মন্ত্র দিয়ে লক্ষজনেরে
 সবল সংগ্রামী আর অগ্রগামী 

করে তোল না কেন?”

কিছু গান থাকে, যা বহিরঙ্গে স্বরের আলিম্পন ছাড়িয়ে ভেতর ঘরের অনুনাদে লিখে রেখে যায় সমাজবীক্ষণের ম্যানিফেস্টো। সময়টা ১৯২৭, দুই বন্ধু ও সহযোগী, কবি অস্কার হ্যামারস্টাইন জুনিয়র এবং সুরকার জেরোম কার্ন তাঁদের আগামী মিউজিক্যাল প্রযোজনা ‘শো বোট’ এর জন্য ‘ওল ম্যান রিভার’ শিরোনামে একটা গান বা আরো প্রচলিত ভাষায় আইটেম নাম্বার তৈরি করছিলেন। পুলিৎজার বিজেতা বিখ্যাত লেখিকা এডনা ফার্বারের একই নামের উপন্যাস ছিল এই মিউজিক্যালের ভিত্তি। আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার ইতিহাস কিছুটা হলেও প্রতিফলিত হয়েছিল এই গীতিনাট্যের আবহে, গান আর গল্পের বাহ্য প্রকরণের গহীনে।
 

দুজনে মিলে ঠিক করেন যে, এই মিউজিক্যাল শো এর চরিত্র বন্দরের এক শ্রমিক এককথায় যাদের স্টিভেডোর বলা হয় সেই জো’র গলাতেই এই গান থাকবে। সুরের কাঠামোতে একটা পেন্টাটনিক বা পাঁচ স্বরের বিন্যাস তৈরি হয়েছে দেখে লেখক অস্কার হ্যামারস্টাইনের পরামর্শে জেরোম কার্ন সুরের একটা বিশেষ নিরীক্ষা করেন। এই মিউজিক্যালের ওপেনিং গান বা নাম্বারে ‘কটন ব্লসম’ এই শব্দবন্ধে ঠিক যে স্বরের প্যাটার্ন ছিল তাকেই উল্টে এবং লয় বা টেম্পো কিছুটা কমিয়ে ‘ওল ম্যান রিভার’ এই কথাগুলোর সুর তৈরি করা হল। এই সাঙ্গীতিক পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে কিন্তু এই গানে শতাব্দী পেরিয়ে শোষণ আর বঞ্চনার একটা আবেশ তৈরি হয়ে গেল, যাকে সুরের ভাষায় থিম্যাটিক মোটিফ কাউন্টার পয়েন্ট বলা যায়। সাঙ্গীতিকভাবে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সোলো গান বা মিউজিক্যাল নম্বর হিসেবে ‘বেস’ ভয়েসের নির্বাচন। কারণ, সাধারণভাবে এসব ক্ষেত্রে ‘ব্যারিটোন’ বা ‘টেনর’ স্বরক্ষেপণকেই নির্বাচন করা হত। 

আরও পড়ুন
আফ্রিকান ক্রীতদাস থেকে দাক্ষিণাত্যের ‘কিং মেকার’, আওরাঙ্গাবাদের প্রতিষ্ঠাতা মালিক অম্বর

আরও পড়ুন
মাথায় বিদ্যুৎ দিয়ে ‘হত্যা’, মিথ্যা অভিযোগে আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল এই কৃষ্ণাঙ্গ বালকের

২৭ শে ডিসেম্বর ১৯২৭, বিখ্যাত ইম্প্রেশারিও ফ্লোরেন্স এডওয়ার্ড জিগফিল্ড জুনিয়র এর প্রযোজনায় ব্রডওয়েতে ‘শো বোট’ এর প্রিমিয়ার ছিল আমেরিকান সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই প্রথম উচ্চবিত্তের বৈঠকখানার আখ্যান পেরিয়ে অপেরেট্টার কাঠামোভাঙা মিউজিক্যাল শোতে ছুঁয়ে গেল অন্য এক ন্যারেটিভ, যাতে লুকিয়ে আছে বঞ্চনার ইতিহাস। প্রথম প্রযোজনাতে জো’ এর ভূমিকায় ছিলেন জুলস ব্লেড’শ, যিনি ১৯২৯ সালে এই মিউজিক্যাল অবলম্বনে নির্মিত আংশিক টকিতেও ওই একই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। দুঃখের বিষয় এই ছায়াছবির কিছু ফুটেজই এখন পাওয়া যায়। তবে জুলস ব্লেড’শ এর গাওয়া এই গানটার অংশ অক্ষত আছে। 

আরও পড়ুন
মাত্র ২২ বছর বয়সে ঘোষণা ‘আমিই আমেরিকা’, বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সোচ্চার মহম্মদ আলি


আরও পড়ুন
মার্কিন সরকারের ‘রহস্য’ ফাঁস সাংবাদিকের, শেষে অবসাদে বেছে নিলেন আত্মহত্যার পথও

জুলস ব্লেড’শ এর কণ্ঠে এই গান কিছুটা জনপ্রিয় হলেও এই গানের মর্মবাণী নিজের দৃপ্তকন্ঠে ধারণ করে শ্রোতাদের চেতনায় গেঁথে দেবার জন্য প্রয়োজন ছিল আরেকজন সমাজ সচেতন শিল্পীর কণ্ঠ। সেই সময়টা এল ১৯২৮ সালে লন্ডনে ‘শো বোট’ এর প্রিমিয়ারে। এই প্রযোজনায় প্রথমবার জো’র চরিত্রে অভিনয় এবং এই গানে কণ্ঠদান করেন মেহনতি মানুষের প্রতিস্বর, পল রোবসন। রোবসনের কণ্ঠে একটা অন্য মাত্রা পেল এই গানের আবেদন। পরে ১৯৩২ সালে ব্রডওয়ের পুনঃপ্রযোজনাতেও অন্য কাউকে ভাবাই গেল না এই চরিত্রে, কারণ ততদিনে ‘ওল ম্যান রিভার’ প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে পল রোবসনের শিল্পীসত্তার সঙ্গে। জেমস হোয়েলের পরিচালনায় ১৯৩৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শো বোট’ ছায়াছবিতে আবারও অভিনয় এবং কণ্ঠদান করলেন পল রোবসন। সেই গান জগদ্বিখ্যাত হল, বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের চেতনায় ‘ওল ম্যান রিভার’ তখন মুক্তির গীতিমালা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 


আমেরিকার সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে ততদিনে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের স্বর আলাদা একটা গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে, পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের আবহে বহু শব্দ হয়ে গেছে বিবর্জিত। ফলে এই গানের আদিরূপে ব্যবহৃত ‘নিগার্স’ শব্দ বদলে পল রোবসন ব্যবহার করলেন ‘ডার্কি’ শব্দ, যা ১৯৩৬ সালের বিখ্যাত চলচ্চিত্রেও ছিল। ১৯৪৬ সালের ব্রডওয়ে প্রযোজনায় এই শব্দ হয়ে দাঁড়াল ‘কালার্ড ফোকস্‌’ এবং আরো পরে তা শুধুই ‘হেয়ার উই অল’ এর শব্দবন্ধে ধরা ছিল যার মধ্যে গায়ের চামড়ার রঙ নিয়ে তথাকথিত সভ্যতার পৈশাচিক অসমীকরণ আর ধরা দেবে না। বিশ্বের প্রথম টকি  জ্যাজ সিঙ্গার (১৯২৭) খ্যাত বিখ্যাত অ্যাল জলসন মতো কিছু শিল্পী আবার গাইলেন ‘লটস্‌ অফ ফোকস্‌’। ততদিনে এই গান একটা আইকনিক জায়গা নিয়েছে আমেরিকান মৌসিকীর মানচিত্রে। অনেক বিখ্যাত গায়ক, গায়িকা কণ্ঠদান করেছেন এতে। যার মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নাম বিং ক্রসবি, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা (১৯৪৬ সালে মুক্তি পাওয়া কালার ছবি   ‘টিল দ্য ক্লাউডস্‌ রোল বাই’তে প্রথমবার), জুডি গারল্যান্ড, স্যামি ডেভিস জুনিয়র অন্যতম।

পল রোবসনের উত্তুঙ্গ পরিবেশনার পাশাপাশি এই গানের ক্ষেত্রে যার গায়নকে রসজ্ঞ শ্রোতারা গুরুত্ব দেন, তিনি হলেন উইলিয়াম ওয়্যারফিল্ড। আভা গার্ডনার অভিনীত ১৯৫১ সালে মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ারের বিখ্যাত রিমেকে তিনি জো’এর চরিত্রে অভিনয় এবং কণ্ঠদান করেন। ওয়্যারফিল্ডের বেস - ব্যারিটোন স্বরে এই গানের গভীরে যে বিষাদ লুকিয়ে আছে তা ফুটে বেরোল এক স্বকীয় ধ্বনিমর্মরতায়। পল রোবসন যেখানে আগুনরাঙা, উইলিয়াম ওয়রফিল্ড সেখানে যেন দরবারীর অতি কোমল গান্ধারের বিষাদ লুকিয়ে রেখেছেন তার পরিবেশনে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৫১ এর সিনেমা সংস্করণে ওই বিতর্কিত লাইন এবং শব্দবন্ধের অনেকটা শুধু ইন্টারল্যুড সুরের আবেশেই বাজল যদিও অনেক পরবর্তীকালে উদ্ধার হওয়া একটি দুর্লভ ক্লিপে উইলিয়াম ওয়রফিল্ডকে পল রোবসনের সংস্করণটিকেই গাইতে শোনা গেছে। 


এই গানের অনেকগুলো পাঠান্তর হয়েছে। আমেরিকান সমাজজীবনে সিভিল রাইট মুভমেন্টের আবহে যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে তারই প্রান্তরেখা ধরে নানা শব্দে এবং বাক্যে এসেছে পরিবর্তন। পরবর্তীকালে অর্থাৎ গত শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকে নানা কনসার্টে পল রোবসনের কণ্ঠে,

"Ah gits weary/An' sick of tryin';/Ah'm tired of livin'/An skeered of dyin',/But Ol' Man River,/He jes' keeps rolling along!"

গানের এই লাইনগুলো হয়ে দাঁড়ায়,

"But I keeps laffin'/Instead of cryin'/I must keep fightin';/Until I'm dyin',/And Ol' Man River, / He'll just keep rollin' along!"

এর মধ্যে "I must keep livin' until I'm dyin,/But Ol' Man River,/ He jes' keeps rollin' along!" অংশ ছিল অস্কার হ্যামারস্টাইন জুনিয়রের নিজেরই লেখা এক পাঠান্তর যা পরে আবিষ্কৃত হয়েছে। মনে রাখা উচিত বর্ণবিদ্বেষ ছাড়াও ওই সময় শুরু হয়েছে ম্যাকার্থিজম অর্থাৎ কম্যুনিজমের ভূতকে আমেরিকার সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে একেবারে সরিয়ে ফেলার প্রচেষ্টা। যার বলি হয়েছেন পল রোবসন সহ চার্লি চ্যাপলিন, ডাল্টন ট্রাম্বো, জুলস ডাসিন এর মতো অনেক গুণীজন।


এই মিউজিক্যালের দ্বিতীয় অঙ্কের সপ্তম দৃশ্যে জো এই গান গায়। পাঁচের দশকে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ভারতীয় গবেষক ছাত্র ভূপেন হাজারিকা পল রোবসনের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেন যার প্রভাবে তিনি মাতৃভাষা অহমিয়াতে ‘বিস্তীর্ণ পাররে’ এই গানটি রেকর্ড করেছিলেন। এই গানের বাণী এবং সুর দুয়েরই মর্মে ছিল ‘ওল ম্যান রিভার’ এর অনুনাদী চেতনা। মিসিসিপি মিশে গেছিল ‘বুড়হা লুইত’ বা ব্রহ্মপুত্রের ঢেউয়ে। গণনাট্যের সূত্রে বাংলার সাংস্কৃতিক বলয়ের সঙ্গে ভূপেন বাবুর সখ্যের কারণে তাঁর অন্যান্য অনেক গানের মতো এই গানেরও বঙ্গানুবাদ হয়। শ্রী শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপূর্ব অনুবাদে মিসিসিপির স্রোত আবার প্রাণ পেল গঙ্গাতীরে। জ্ঞান-বিহীন নিরক্ষরের, খাদ্যবিহীন নাগরিকের নেতৃত্বহীনতায় মৌন সমাজকে আক্ষরিক অর্থেই সিসমিক ঝাঁকুনি দিয়ে গেল কথা সুরের দ্যোতনায় সেই বঞ্চিত মানুষের সংগ্রামের বার্তা যা রাষ্ট্রের ভূগোলের গণ্ডি পেরিয়ে অভুক্ত জঠরজ্বালায় আমাদের একাত্মবোধের পাঠ দেয় যুগে যুগে। পেন্টাটনিক স্বরমালিকা পেরিয়ে এই একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অঙ্কের সপ্তম দৃশ্যে ‘ওল ম্যান রিভার’ তাই আমাদের জাগ্রতচিত্তে আজও মুক্তির দিশা দিয়ে যাচ্ছে অবিরত।

তথ্যঋণঃ আন্তর্জালে প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধ, ফিলিপ হেইজ ডিনের লেখা পল রোবসন জীবনী, হ্যাল লেনার্ড কোরের লেখা দ্য গ্রেট আমেরিকান সংবুক।

চিত্র ঋণঃ আন্তর্জাল।

Powered by Froala Editor

Latest News See More