সুদূর তাসখন্দে বিষপ্রয়োগে হত্যা? লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু আজও রহস্যে ঘেরা

১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাস। কুয়াশার রহস্য অতিক্রম করে দিল্লি বিমানবন্দরে অবতরণ করল একটি বিশেষ বিমান। মাটি ছোঁয়ার পরই বিমান থেকে বার করা হল একটি দেহ। ছোট্ট একটি শরীর; শান্ত, ক্লান্ত মুখ। পরিবারের লোকেদের সঙ্গে উচ্চপদস্থ আমলা, নেতা থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম— সবাই এগিয়ে গেল সেইদিকে। এক মুহূর্ত স্তম্ভিত সকলে। দেহটা যেন নীল হয়ে আছে! মুখেও সেই মৃত্যুর ছাপ ছড়িয়ে পড়েছে। কপালের দু’পাশে সাদা সাদা ছোপ। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী…

বিমানবন্দরে দেহ দেখেই সন্দেহ হয় শাস্ত্রীজির পরিবারের লোকেদের। মৃত্যুর পর এরকম অদ্ভুত চেহারা হয়ে যাবে কেন তাঁর! দিব্যি তো তাসখন্দে গেলেন, আগের রাতে বাড়িতে ফোন করলেন। তারপর কী এমন হল যে, মারা গেলেন তিনি? আর শরীর, মুখ এমন নীল হয়ে থাকবে কেন? অনেক প্রশ্ন উঠে এল সেখানেই। কিন্তু ভারত সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা করা হল, আচমকা হৃদরোগেই মৃত্যু হয়েছে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর। 

ঠিক কী হয়েছিল? আপাত নিরীহ মানুষটি কি সত্যিই হৃদরোগের শিকার হয়েছিলেন, নাকি পেছনে ছিল অন্য কোনো রহস্য? সময়ের চাকা ধরে আরেকটু পেছনে যাওয়া যাক। ১৯৬৪ সাল। জওহরলাল নেহরুর পর দেশের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। এমন একটা সময় মসনদে বসলেন, যখন ভারতের বুকে যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে। ’৬২-তেই চিনের সঙ্গে যুদ্ধ হয়ে গেছে; এখনও লাল ফৌজ ভারতের সীমান্তে হামলা চালাচ্ছে। তারই মধ্যে নিঃশ্বাস ফেলছে পাকিস্তান। এদিকে যুদ্ধ শুরু হওয়া মানে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনও ক্রমশ খারাপ হওয়া। অর্থাভাব, খাদ্যদ্রব্যের সংকট দেখা দিয়েছিলই। অতঃপর, ১৯৬৫-তে এসে রণাঙ্গনে মুখোমুখি হল ভারত ও পাকিস্তান। যুদ্ধ কি চেয়েছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী নিজেও? 

যুদ্ধ চলছে; এবং উল্টোদিকে দেশের মানুষের মনোবল মজবুত রাখতে উদ্যোগী হচ্ছেন শাস্ত্রীজি। একটা সময় দুই বাহিনি সন্ধি করতে রাজি হয়। তবে ভারতে বা পাকিস্তানে নয়, সেই চুক্তি হোক কোনো নিরপেক্ষ একটি জায়গায়। শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হল তাসখন্দকে। লালবাহাদুর শাস্ত্রী। ১০ জানুয়ারি, ১৯৬৬। দুই দেশের মধ্যে মউ স্বাক্ষরিত হল। সম্পন্ন হল তাসখন্দ চুক্তি। যুদ্ধও থামল… 

আসল রহস্য এরপর থেকে শুরু। আর সেই কথা বলতে গিয়ে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে আরও একজনের কথা। তিনিও ছিলেন ভারতীয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম অগ্রণী চরিত্র। এবং তাঁর নিখোঁজ হওয়া নিয়েও রয়েছে চূড়ান্ত রহস্য। হ্যাঁ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। মৃত্যু আর রহস্য কোথাও গিয়ে এই দুজনকে এক করে দিয়েছে। আর অদ্ভুতভাবে, লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর সঙ্গে কোথাও জড়িয়ে আছে তাঁর নামও। তাসখন্দ চুক্তি সেরে নির্ধারিত হোটেলে ফিরে আসেন প্রধানমন্ত্রী। রাতের খাবার খেয়ে নিয়মমাফিক এক গ্লাস দুধ খান। তার আগে অবশ্য ফোন করেন নিজের বাড়িতে। সবাই কেমন আছে, খাওয়া হয়েছে কিনা— এমনই কথোপকথন চলছিল। শোনা যায়, সেই সময়ই তিনি পরিবারকে একটি অদ্ভুত কথা বলেন। তাসখন্দে এক ‘বিশেষ মানুষের’ সঙ্গে নাকি দেখা হয়েছে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর। এবং সেই খবর দেশে এসে জানালে সবাই অবাক হয়ে যাবে! কে ছিলেন সেই রহস্যময় ব্যক্তি? জানা যায়নি। তবে এক অংশের মতে, তাসখন্দে স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বসুকে দেখেছিলেন শাস্ত্রীজি! এই প্রসঙ্গেই তাঁরা তুলে আনবেন রহস্যময় ‘তাসখন্দ ম্যান’-এর কথা। চুক্তির সময় যিনি ওই জায়গায় উপস্থিত ছিলেন, ছবিতেও তাঁর দেখা মেলে। তাহলে তিনিই কি… 

সেই রহস্য তখন রহস্যই থেকে গেছে। যে মানুষটি এই রহস্যের উদঘাটন করতে পারতেন, তাঁর সেই রাত্রেই শুরু হয় বুকে যন্ত্রণা। কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু। ঘটনার চালচিত্র কি পুরোই কাকতালীয়? না এর ভেতরে কোনো গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে? তা নাহলে আজও কেন লালবাহাদুর শাস্ত্রীর পরিবারের দাবি অনুযায়ী কোনো তদন্ত হয়নি? অদ্ভুতভাবে, প্রধানমন্ত্রীর ময়নাতদন্তের দাবিও খারিজ করে দেওয়া হয়। রহস্যজনকভাবে দুর্ঘটনায় মারা যান লালবাহাদুর শাস্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও তাঁর দুই ছেলে। আর ওই রাতে যিনি খাবার পরিবেশন করেছিলেন, সেই জান মহম্মদ চাকরি পান রাষ্ট্রপতি ভবনে। কেন এত গোপনীয়তা? তাহলে কি সত্যিই বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল শাস্ত্রীজিকে? এমন বিষ, যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে হাজির হয় হার্ট অ্যাটাক? শরীর নীল হয়ে যাওয়ার রহস্য কী? এবং সবশেষে, ফোনে উল্লিখিত ওই বিশেষ মানুষটি কে ছিলেন? 

আরও পড়ুন
শেষ ১৪ বছরে পাঁচবার হত্যার চেষ্টা, ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী

অনেক প্রশ্ন। অনেক রহস্য। কিন্তু উত্তর খুবই সামান্য। বহু বছর ধরে সাংবাদিক ও গবেষকরা এই নিয়ে কাজ করে আসছেন। যে মানুষটি ‘জয় জওয়ান, জয় কিষাণ’ মন্ত্রে গোটা দেশকে এক করেছিলেন, সেই শান্তিপ্রিয়, ভদ্র মানুষটার এমন পরিণতি হল কেন? ভারতের ইতিহাসে এই রহস্য নিয়েই বসে আছেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী… 

তথ্যসূত্র-
১) ‘‘খুন হয়ে থাকতে পারেন লাল বাহাদুর’, ফাইল প্রকাশের দাবি পরিবারের’, আনন্দবাজার পত্রিকা,
২) ‘মৃত্যুর ৪০ মিনিট আগে ফোনে শাস্ত্রীজির মুখে ‘রাশিয়ায় বিশেষ ব্যক্তির’ কথা, তিনিই কী ছিলেন নেতাজি?’, জি ২৪ ঘণ্টা ওয়েব
৩) ‘দুধেই কি ছিল বিষ? আজও রহস্যে মোড়া লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু’, সংবাদ প্রতিদিন

Powered by Froala Editor

আরও পড়ুন
খুন হয়েছিলেন রামমন্দিরের পুরোহিত বাবা লাল দাস-ও; বাবরি ধ্বংসের বিরোধিতাই ‘অপরাধ’?

More From Author See More