অনূদিত হোক কবিতার আত্মা : জয় গোস্বামী

“জয় গোস্বামীর (Joy Goswami) কবিতার জগৎ, তাঁর মেটাফোর, তাঁর শব্দদৃশ্য, অন্তর্লীন ছন্দ— এগুলো ইংরাজি ভাষায় অনুবাদ করা কঠিন তো বটেই, কখনও কখনও অসম্ভব। সে-কারণে কোথাও কোথাও আমি কিছু কিছু বাংলা শব্দ অপরিবর্তিত রেখে দিয়েছি। মুখাগ্নির কোনো অনুবাদ করিনি, করা যায় না। কিন্তু চেষ্টা করেছি, কবিতার অন্তর্বস্তুটাকেই অনুবাদ করতে। নাহলে গোটা বইটাই হয়ে যাবে টীকার সমাহার।”

বলছিলেন বিশিষ্ট কবি, অনুবাদক, সম্পাদক ও লেখক সম্পূর্ণা চ্যাটার্জি (Sampurna Chattarji)। যাঁর অনুবাদের হাত ধরে জয় গোস্বামীর কবিতা পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক পাঠকবৃত্তের কাছে। পৌঁছেছে ভিন ভাষাভাষীর মানুষের কাছে। জয় গোস্বামীর দুটি কবিতার সংকলন অনুবাদ করেছেন সম্পূর্ণা। 

‘ক্যান্টো’ (Canto 2023) আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে, ১৯ মার্চ, জয় গোস্বামীর সঙ্গে সম্পূর্ণা চ্যাটার্জির কথোপকথনে তৈরি হচ্ছিল এক বিস্ময়কর আবহ। জয় গোস্বামী পাঠ করছিলেন নিজের কবিতা। সেই কবিতার অনুবাদ পাঠ করছিলেন সম্পূর্ণা। কিন্তু কবিতাপাঠ আর তার অনুবাদ— এই পারম্পর্যে সে-আলোচনা আটকে থাকেনি। তা ক্রমে পৌঁছে গিয়েছিল কবিতার অনুবাদ, জয় গোস্বামীর কবিতার ভাববস্তু, নিজের কবিতার অনুবাদ নিয়ে কী ভাবেন জয় গোস্বামী— এরকম নানা প্রেক্ষিতে। 

আলোচনার শুরুতে আলোচনার মূল সুতোটি বেঁধে দেন ‘ক্যান্টো’ কবিতা উৎসবের অন্যতম উপদেষ্টা ও উদ্যোগপতি অনিতেশ চক্রবর্তী। অনিতেশ উল্লেখ করেন, “সম্পূর্ণা চ্যাটার্জির অনুবাদ ছাড়া হয়তো জয় গোস্বামীর কবিতার আত্মাকে বুঝতে অসুবিধাই হত ভিন ভাষাভাষী পাঠকদের।” এখানেই নিহিত ছিল এই আলোচনা কোথায় বাঁক নেবে। 

আরও পড়ুন
মৃত্যুকে সেভাবে গুরুত্ব দেননি মহাভারতের ‘কবিরা’: ওয়েন্ডি ডনিগার

শুরুটা হয়েছিল কবিতাকে আঁকড়েই। বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছে। আর জয় গোস্বামী ‘সূর্য পোড়া ছাই’ থেকে পড়ছেন একের পর এক কবিতা। শুধু কবিতা পাঠ নয়, সে-কবিতা কোন অনুষঙ্গে লেখা, সেই কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোন স্মৃতি, কোন নিবিড়ি পাঠ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা এবং গণিত নিয়ে পড়াশোনা করার নানা অনুষঙ্গ— কবিতা পড়ার ফাঁকে এসবই বলতে বলতে যাচ্ছিলেন জয়। ফলে তা নিছক কবিতাপাঠ থাকছিল না। তা হয়ে উঠছিল, কবিতার জন্ম নেওয়ার গণনাও। এবং সেই কবিতার ইংরাজি অনুবাদ পাঠ করছিলেন সম্পূর্ণা।

আরও পড়ুন
দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ভ্রাম্যমাণ কবিতা উৎসব, সাক্ষী রইল দিল্লি-কলকাতা

এই আবহে প্রশ্ন আসে দর্শকদের থেকে, সম্পূর্ণা চ্যাটার্জি জয় গোস্বামীর কবিতার এই আত্মাকে, জগৎকে যে অনুবাদ করতে পারলেন ইংরাজিতে, তার অন্যতম কারণ কি সম্পূর্ণা চ্যাটার্জি নিজে বাঙালি? বাঙালি না হলে কি জয় গোস্বামীর কবিতার এই বিস্তারকে ধরা সত্যিই সম্ভব ছিল অন্য একটি ভাষায়? না, এই প্রশ্নের উত্তরে জটিল অ্যাকাডেমিক ব্যাখ্যার পথে হাঁটেননি সম্পূর্ণা। তাঁর কথায়, “কাব্যসৃষ্টির মতো অনুবাদও একটা অনুশীলন। কবি হিসাবে আমার যা কাজ, অনুবাদ তারই এক সমান্তরাল অনুশীলন।” অনুবাদের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই যাতে কবির উপবদ্ধি, দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শন কিংবা শব্দের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অবদমিত না হয়— তা নিশ্চিত করাই অনুবাদকের কাজ। সম্পূর্ণার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, কবিতার অনুবাদক হতে গেলে কোথাও গিয়ে কবি হওয়াও আবশ্যিক বইকি।

গত ১৫ ও ১৬ মার্চ, ‘ক্যান্টো’ উৎসবের প্রথম পর্ব আয়োজিত হয়েছিল নয়া দিল্লির ‘ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো সেন্টার’-এ। “আমরা চাইলে এই কবিতা উৎসবের দ্বিতীয় পর্বের আয়োজন করতে পারতাম কেরল, মুম্বাই কিংবা ভারতের অন্যত্র। কিন্তু আমরা আলোচনা করেছিলাম, ভারতে যদি কোনো কবিতাচর্চার রাজধানী বা কেন্দ্রবিন্দু থেকে থাকে, তবে সেটা কলকাতা। তাকে বাদ দিয়ে এই উৎসব শেষ হতে পারে না”, বলছিলেন ক্যান্টোর পরিচালক, বিশিষ্ট লেখক ও সঞ্চালক অভীক চন্দ। আগামীতে বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক ও আন্তর্জাতিক ভ্রাম্যমাণ এই কবিতা উৎসব প্রতিবছরই আয়োজিত হবে, তারও ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন তিনি।

Powered by Froala Editor