প্লাস্টিক দূষণের ভয়ঙ্কর পরিণাম বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিল যে-ছবি!

বালির ওপর পড়ে রয়েছে একটি মৃত পাখির দেহ। পচে গেছে দেহের মাংস। অবশিষ্টাংশ বলতে কেবলমাত্র কয়েকটি হাড়, চঞ্চু এবং পালক। আর তার মাঝখান থেকেই উঁকি দিচ্ছে প্লাস্টিকের ছোটো বোতল, ঢাকনা, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সামগ্রী। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে দাঁড়িয়ে এই ছবি দেখেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বলতে গেলে, সাম্প্রতিক সময়ে এই ছবিই প্রতীক হয়ে উঠেছে প্লাস্টিক দূষণের (Plastic Pollution)। কিন্তু এই ছবির পিছনে লুকিয়ে রয়েছে কোন নেপথ্য-কাহিনি?

পিছিয়ে যেতে হবে দেড় দশক। ২০০৯ সাল। প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত ছোট্ট একটি দ্বীপ মিডওয়ে অ্যাটলে বেড়াতে গিয়েছিলেন ফটোগ্রাফার ক্রিস জর্ডন। হনুলুলুর ১৩০০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই দ্বীপে বসবাস লক্ষ লক্ষ সামুদ্রিক পাখির। যার মধ্যে রয়েছে বনিন পেট্রেল, অ্যালবাট্রস, হোয়াইট টার্ন, গ্রেট ফ্রিগেটবার্ড ইত্যাদি বিরল প্রজাতি। বলতে গেলে যে-কোনো পক্ষীপ্রিয় মানুষের কাছেই এ-এক স্বর্গরাজ্য। জর্ডন নিজেও গিয়েছিলেন এইসব পাখির ছবি তুলতে। তবে প্রত্যন্ত এই দ্বীপে ঘুরে বেড়ানোর সময়ই তাঁর নজর কাড়ে এইসব পাখিদের ট্র্যাজিক পরিণতি। 

দু-একটি ঘটনা নয়। সমুদ্রতটে মাইলের পর মাইল জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত পাখির মৃতদেহ। কোনোটির দেহাবশেষ পচে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে কঙ্কাল, কোনোটিতে পচন ধরেনি তখনও। জর্ডন পরীক্ষা করে দেখেন, প্রতিক্ষেত্রেই পাখিদের মৃত্যুর সঙ্গে কোনো-না-কোনোভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিক। কোথাও মাছ ধরার জালে পাখনা ও পা জড়িয়ে মৃত্যু হয়েছে পাখির। কখনও আবার পচা-গলা দেহ থেকে উঁকি দিচ্ছে প্লাস্টিক। সমুদ্রে মাছ ধরার সময় প্লাস্টিক বর্জ্য গিলে ফেলেছে তারা। 

এই ছবিগুলো যে-সময়ে তোলা তখনও পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সর্বজনীন হয়ে ওঠেনি সোশ্যাল মিডিয়া। তা-সত্ত্বেও তৎকালীন সময়ে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল পরিবেশদূষণের এই ভয়ঙ্কর ছবি। যা হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল পরিবেশবিদদের। এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সাড়া পড়ে গিয়েছিল রীতিমতো। লক্ষ লক্ষ চিঠি আসতে শুরু করে জর্ডনের ঠিকানায়। অনেকে আবার ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাজির হয়েছিলেন মিডওয়ে অ্যাটলে। শুরু করেছিলেন প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণের কর্মকাণ্ড। এমনকি এই ছবিকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে যে পরিবেশ আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার সৌজন্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ হয় একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক। 

এর পর পেরিয়ে গেছে প্রায় দেড় দশক। অবশ্য আজও কোনো স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়নি প্লাস্টিক দূষণের। এমনকি ডব্লুডব্লুএফ-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ২০৪০ সাল নাগাদ প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে দ্বিগুণ। ফলস্বরূপ, ২০৫০ সাল নাগাদ প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ৪ গুণ বৃদ্ধি পাবে। ২০১৮ সালে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব সামনে আনতে দুটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন জর্ডন। পেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং স্বীকৃতিও। এবার এমত পরিস্থিতিতে, জনসচেতনতা গড়ে তুলতে ফের ক্যামেরাকেই হাতিয়ার করে নিতে চান জর্ডন। আগামীদিনে বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তে ঘুরে ঘুরে প্লাস্টিক দূষণের অস্বস্তিকর দৃশ্য ফ্রেমবন্দি করবেন বলে জানাচ্ছেন তিনি। 

Powered by Froala Editor