কলেরার বিষ আবিষ্কার করলেন শম্ভুনাথ দে, বারংবার সুপারিশ সত্ত্বেও অধরা নোবেল

পঞ্চাশের দশক। শুধু কলকাতা বা ভারত নয়, বিশ্বের অন্যান্য জায়গাতেও ভয়ানক আকার নিয়েছে একটা রোগ। কলেরা। বহু বছর ধরে এর প্রকোপে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। এমন সময় কলেরার প্রতিষেধক তৈরি করার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন এক বাঙালি চিকিৎসক তথা বিজ্ঞানী। কলেরার বিষ একসময় আবিষ্কারও করে ফেললেন তিনি। পৃথিবী রক্ষা পেল একটা অসুখ থেকে। এত বড় কাজ করে, আজও অনুচ্চারিতই থেকে গেলেন সেই বাঙালি চিকিৎসকটি। পাননি নোবেল পুরস্কারও। তিনি, কলকাতার চিকিৎসক ডঃ শম্ভুনাথ দে।


১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসে হুগলির গড়বতি গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন শম্ভুনাথ। ছোট থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। স্কলারশিপ পেয়ে ১৯৩৫-এ তিনি ভর্তি হন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যান এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করে ফিরে আসেন দেশে। সেই সময় থেকেই মূলত কলেরা নিয়ে তাঁর গবেষণা শুরু। কীভাবে বের করবেন কলেরার ওষুধ, সেই চেষ্টায় দিবারাত্র পরিশ্রম করতে লাগলেন।

কলেরা— এই রোগটির প্রকোপে এখন হয়ত কেউ মারা যান না। অসুস্থ হলে, ঠিকঠাক প্রতিষেধক এবং চিকিৎসার সহায়তায় সেরে ওঠেন রোগী। কিন্তু একটা সময়, এই কলেরাই মহামারির মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। শুধু ভারত নয়, ইউরোপ এবং অন্যান্য জায়গাতেও ছড়িয়ে পড়েছিল এই রোগ। এমনকি ১৯৫০ সালের হিসেব অনুযায়ী, ১ লাখ ৭৬ হাজার কলেরা আক্রান্তের মধ্যে মারা গেছেন ৮৬ হাজারেরও বেশি রোগী। তার আগে অবস্থা আরও ভয়াবহ ছিল। শম্ভুনাথ যখন কলেরার বিষ এবং প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণায় এলেন, ততদিনে অবশ্য কলেরার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কার করা হয়ে গেছে। কিন্তু তাও এর ওষুধ তৈরি করা যাচ্ছিল না। কলেরার জন্য দায়ী যে ব্যাকটেরিয়া, সেই ভিব্রিও কলেরি থেকে কীরকম বিষ নির্গত হয়, তার চরিত্র, রাসায়নিক গঠনই বা কী, সেইসমস্তও জানা যায়নি। ১৯৫৭ সালে বসু বিজ্ঞান মন্দিরে সেই গবেষণার কাজ আরম্ভ করলেন শম্ভুনাথ। তার তিন বছর পর, ১৯৬০ সালেই ঘটল সেই মিরাকেল! ভিব্রিও কলেরির বিষের প্রকৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরলেন ডঃ শম্ভুনাথ দে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে যেন একটা নতুন দরজা খুলে গেল। কলেরার প্রতিষেধক তৈরি করতে আর কোনও অসুবিধাই রইল না। শম্ভুনাথ এরপরেও গবেষণার অগ্রগতি বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু এইরকম গবেষণার জন্য যে পরিকাঠামোর দরকার হয়, সেটা ছিল না। ফলস্বরূপ থেমে যায় তাঁর গবেষণা।

আরও পড়ুন
হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আবিষ্কার করে নোবেলজয়ী তিন বিজ্ঞানী

নোবেলজয়ী প্রফেসর যোশুয়া লেন্ডারবার্গ একাধিকবার নোবেল কমিটির কাছে পেশ করেছিলেন শম্ভুনাথ দে’র নাম। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে তা গ্রাহ্য হয়নি কোনোবারই।

১৯৭৮ সালে নোবেল সিম্পোসিয়াম কমিটির ডাকে কলেরা ও ডায়রিয়ার ওপর আয়োজিত সেমিনারে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি। সেই বক্তৃতায় প্রবীণ এই চিকিৎসক বলেছিলেন –

আরও পড়ুন
ক্যানসারের আক্রমণের শিকার ছিল ডাইনোসরও! সাম্প্রতিক আবিষ্কারে চাঞ্চল্য

I have been dead since the early 1960’s, I have been exhumed by the Nobel Symposium Committee and these two days with you make me feel that I am coming to life again.

১৯৮৫ সালে মৃত্যু হয় তাঁর। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হল, ওঁর এই গবেষণার কথা, এই আবিষ্কারের কথা পরবর্তীকালে কেউ মনে রাখল না। যে কলেরা আজ মারণ রোগের তালিকা থেকে মুছে গেছে, তার স্বীকৃতি যাঁদের প্রাপ্য, শম্ভুনাথ দে নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু তৎকালীন বিদেশের কয়েকজন বিজ্ঞানী ছাড়া আর কেই বা উল্লেখ করল তাঁর? বিদেশ তো দূরের কথা, আমরাই বা কতটা মনে রেখেছি তাঁকে?

আরও পড়ুন
আক্রান্ত হওয়ার ২০ বছর আগেই জানা যাবে অ্যালজাইমার্সের উপস্থিতি, যুগান্তকারী আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের

তথ্যসূত্র -
১। An Unsung Indian Scientist, D. Chattopadhyay
২। বিস্মৃতপ্রায় শম্ভুনাথ দে: কলেরার গবেষণায় রবার্ট কখকে যিনি ভুল প্রমাণ করেছিলেন, অতনু চক্রবর্তী, রোর বাংলা
৩। Tribute: Dr. Sambhu Nath De: One of the Greatest Indian Scientists, Shanta Dutta, Surojit Das, AK Nandy, Subir K Dutta

Powered by Froala Editor

More From Author See More

Latest News See More