বন্যা রোধ থেকে নতুন শহর নির্মাণ – এম বিশ্বেশ্বর ও ভারতের ‘ইঞ্জিনিয়ার দিবস’

ভারতের কলেজগুলি থেকে প্রতি বছর লাখে লাখে ছেলেমেয়ে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পাশ করে। মা-বাবাদেরও তাই ইচ্ছা। সন্তানকে হয় ইঞ্জিনিয়ার, নয় ডাক্তার, নিদেনপক্ষে উকিল হতে হবে। তাহলেই যেন অর্থ আর ভবিষ্যৎ আকাশে উড়বে! আজ থেকে একশো বছর আগেও এক তরুণ ভেবেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কথা। স্রেফ চাকরির জন্য না, একটা স্বপ্নের জন্য। এম বিশ্বেশ্বর ছুটে গেছেন সেই স্বপ্নের দিকে। 

কর্ণাটকের এক সংস্কৃত পণ্ডিতের ঘরে জন্ম নেন মোকসাগুন্দম বিশ্বেশ্বর। বাবার স্বপ্ন ছিল, ছেকে যেন নিজের মেধার সদ্ব্যবহার করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা দেখতে যেতে পারেননি। বিশ্বেশরের অল্প বয়সেই তিনি চলে যান। এদিকে ঘরে সেরকম টাকা নেই। স্কুলে কী করে পড়াবেন? নিজে নিজে পড়েই স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন তিনি। গ্র্যাজুয়েশন করার পর পুনেতে, কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার সময় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। 

এরই মধ্যে মহারাষ্ট্রের সরকারি চাকরিতেও যুক্ত হন সেই সময়। সেসব ইংরেজদের জমানা, ইংরেজদেরই রমরমা। সেখানে এই ভারতীয় কী  করবে? এক এক করে কাজ করে দেখাতে আরম্ভ করলেন। নাসিক থেকে পুনে, সব জায়গায় পৌঁছে গেলেন তিনি। এরপর ভারত সরকারের অধীনেও অংশগ্রহণ করলেন। যেকোন জায়গার গুরুত্বপূর্ণ নিকাশি ও সেচজনিত সমস্যা দেখে দিলে আর কেউ না থাকুক, এম বিশ্বেশ্বর থাকবেনই। 

বিংশ শতকের শুরুর দিকে হায়দ্রাবাদ এবং তার আশেপাশের অঞ্চল এক ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়ে। বীভৎস বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব। জীবনের অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। সেই সময় ইঞ্জিনিয়ারদের একসঙ্গে করে এই বন্যা প্রতিরোধ করার উপায়ের কথা ভাবতে বলল সরকার। এঁদের স্পেশ্যাল কাউন্সেলিং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে স্থান পান এম বিশ্বেশ্বর। যাই হোক, তাঁর প্রচেষ্টায় ও কাজে হায়দ্রাবাদের বন্যা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা আগের থেকে আরও মজবুত হল। প্রশাসনও খুশি, সঙ্গে জনতাও। ওই সময়ই তাঁকে মাইসোরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার করে দেওয়া হয়। সেইসময়ের সংবাদপত্র থেকে বোঝা যায়, গোটা কর্ণাটকে এম বিশ্বেশ্বরকে কীভাবে শ্রদ্ধা আর সম্মান জানানো হত। 

সেইসঙ্গে করেছিলেন আরও একটি জিনিস। ব্যাঙ্গালোরের দক্ষিণে পরিকল্পনা করে তৈরি করেন একটি ছোট্ট এলাকা, নাম জয়নগর। এশিয়া এর আগে এমন উদ্যোগ দেখেনি। সেইসঙ্গে ভারত সরকারের কাছে আবেদন করতে থাকেন ব্যাঙ্গালোরে। সেইমতো ১৯১৭ সালে খোলা হয় গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ অফ ব্যাঙ্গালোর। ভারতের প্রথম দিকে শুরু হওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর একটি। ১৯২৩ সালে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক কর্ণাটকের জনক… 

আর পুরস্কার? সেই তালিকা শুরু করলেন আজকের এই গল্প শেষ হবে না। এম বিশ্বেশ্বর না থাকলে মাইসোর আর কর্ণাটকের শিল্পের বিকাশ হয়তো হতই না। ১৯১১ সালে নিজে শুরু করেছিলেন ‘মাইসোর ইকোনমিক ফোরাম’। তাঁরাই একদম প্রাথমিক স্তর থেকে শিল্পের ব্যবস্থা শুরু করেছেল। কখনও তেলের কারখানা, সাবানের কারখানা, পড়ে আবার টেক্সটাইল এসব নিয়েই শুরু হয় লড়াইটা। আজকের কর্ণাটক, ব্যাঙ্গালোরের ঝাঁ-চকচকে চেহারা ও শিল্পের অনুকুল পরিস্থিতি এম বিশ্বেশ্বর না থাকলে কী হত? বিনা কারণে যে ‘ভারতরত্ন হওয়া যায় না… ’ 

আরও পড়ুন
বইমেলায় ঘুরে-ঘুরে বিক্রি করতেন নিজের বই; মানুষের কাছাকাছি যেতে ‘সংকোচ’ ছিল না তাঁর

Powered by Froala Editor

More From Author See More

Latest News See More