ভায়োলিনের সুরে মাতিয়েছেন দেশ, প্রয়াত ‘পদ্মভূষণ’ টি.এন. কৃষ্ণন

পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র। তা বলে কি ভারতীয় সঙ্গীত ফুটে উঠতে পারে না তাতে? আলবাত পারে। এবং তা যে ম্যাজিকের থেকে খুব কিছু কম নয়, দেখিয়েছিলেন ত্রিপ্পুনিথুরা নায়ারানাইয়ার কৃষ্ণন। যিনি ভায়োলিনের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন ক্লাসিকাল রাগ সঙ্গীত। পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন কর্ণাটকি সঙ্গীতের। ৯২ বছর বয়সে চলে গেলেন ভারতের অন্যতম বেহালাবাদক। শেষ হল ভারতীয় সঙ্গীতের একটি দীর্ঘ অধ্যায়। বার্ধক্যজনিত সমস্যার কারণে সোমবার চেন্নাইতে জীবনাবসান হয় এই ভায়োলিন বাদকের।

১৯২৮ সালে কেরালায় জন্ম কৃষ্ণনের। সঙ্গীতের জগতে ঢুকে পড়া বাবার হাত ধরেই। ভায়োলিনের প্রথম শিক্ষকও ছিলেন তাঁর বাবাই। মাত্র ১১ বছর বয়সে ত্রিবান্দ্রামে প্রথম মঞ্চ প্রদর্শনী। কিশোর বয়সেই সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ করেছিলেন শ্রোতাদের। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। মৃত্যুর আগে অবধি বাবাই ছিলেন তাঁর সঙ্গীত শিক্ষক।

চল্লিশ দশকের গোড়ার দিকে পরিবারের সঙ্গে চেন্নাইতে চলে আসেন তিনি। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় ভারতীয় ক্লাসিকাল সঙ্গীতের সঙ্গে। চেন্নাইতে কিংবদন্তি সেমাঙ্গুদি শ্রীনিবাস আইয়ারের সাহচর্য পেয়েছিলেন। ধীরে ধীরে পাশ্চাত্য যন্ত্রে মিশতে থাকে রাগের ঘনঘটা। চেন্নাইতে সঙ্গীতজ্ঞ ও ব্যবসায়ী আর. আইয়াদুরাইয়ের বাড়িতেই দীর্ঘদিন থেকেছেন তিনি। সেখানে থেকেই চলেছে সঙ্গীতের চর্চা, শিক্ষা। অদূরেই অংশ হয়ে গিয়েছিলেন শ্রীনিবাস আইয়ারের পারিবারিক সঙ্গীত ঘরানার।

কৃষ্ণন কোচিন রাজপরিবারে সঙ্গীতের আসর মাতিয়েছেন সেই শুরুর দিকে। সে সময় একের পর এক আসরে ডাক আসতে থাকে তাঁর। স্থানীয় ভাষায় যে সঙ্গীতের আখড়াকে বলা হত কাছেরি। আয়জিত হত দক্ষিণের বিভিন্ন রাজপরিবার, মন্দির আর জমিদার বাড়িতে। একটানা তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সেখানে বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন কৃষ্ণন। শ্রোতাদের ভুলিয়ে দিতেন সময়ের হিসেব।

পরবর্তী সময়ে লালগুড়ি জয়ারমন এবং এম. এস. গোপালাকৃষ্ণনের সঙ্গে ভায়োলিন ট্রায়ো তৈরি করেন তিনি। মাদ্রাজ মিউজিক অ্যাকাডেমিতে দীর্ঘদিন একটানা বাজিয়েছেন ভায়োলিন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মারঘাজি মিউজিক সেশন। বড়দিনের সকালে তাঁর জন্য রাখা থাকত বিশেষ সময়সূচি। চেন্নাইয়ে তাঁর বাজানো ‘জিঙ্গল বেল’ পরিণত হয়েছিল কিংবদন্তিতে। যা না বেজে উঠলে তৈরি হত না বড়োদিনের আমেজ।

সঙ্গীত প্রদর্শনীর সঙ্গে চেন্নাইয়ের মিউজিক কলেজে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন। পরবর্তীতে এই কলেজেই অধ্যক্ষের পদাসীন হয়েছিলেন কৃষ্ণন। ছিলেন দিল্লি স্কুল অফ ফাইন আর্টস এন্ড মিউজিকের ডিন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল অবধি সঙ্গীত নাটক অকাদেমিতে সহ-সভাপতির দায়িত্বও ছিল তাঁর কাঁধে।

আরও পড়ুন
প্রয়াত শন কনেরি, উল্টে গেল জেমস বন্ডের একটি পাতাও

১৯৭৩ সালে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন কৃষ্ণন। ১৯৮০ সালে মাদ্রাজ মিউজিক অ্যাকাডেমির সর্বোচ্চ সঙ্গীত সম্মান ‘সঙ্গীথা কালানিধি’ উপাধি পান তিনি। নব্বইয়ের দশকে তাঁর মুকুটে জোড়ে পদ্মভূষণের পালকও। 

তাঁর নিজের বাড়িই হয়ে উঠেছিল কর্ণাটকি সঙ্গীতের পীঠস্থান। তাঁর তৈরি ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের ধারা বর্তমানে বহন করে যাচ্ছেন তাঁর কন্যা ভিজি কৃষ্ণন নটরাজন ও পুত্র শ্রীরাম কৃষ্ণন। শেষ বয়স অবধি সঙ্গীতকেই আঁকড়েই বেঁচে ছিলেন তিনি। তবে শেষ কয়েক বছরে শারীরিক অসঙ্গতির জন্যই বন্ধ হয়েছিল মঞ্চ প্রদর্শনী।

টি. এ. কৃষ্ণনের মৃত্যুতে ভারতীয় সঙ্গীত জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাঁর মৃত্যুসংবাদে শোকপ্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। শেষ হল ভারতীয় সঙ্গীতের একটি অধ্যায়। তবে সে অধ্যায়ের পাঠ শেষ হওয়ার নয়। পুত্র-কন্যাকে সেই সুরের আবহ বয়ে নিয়ে যাওয়ারই দায়িত্ব দিয়ে গেলেন কৃষ্ণন। সেই সঙ্গে সুরের জাদুর দীক্ষা দিয়ে গেলেন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকেও...

আরও পড়ুন
প্রয়াত ইউরেনিয়াম-বিরোধী আন্দোলনের ‘জননী’ কং-স্পিলিটি, শেষ হল মেঘালয়ের একটি অধ্যায়

Powered by Froala Editor

More From Author See More

Latest News See More