রবীন্দ্রনাথের বড়দা তিনি, অগোছালো, পাণ্ডুলিপির ছেঁড়া পাতা ছড়িয়ে থাকত জোড়াসাঁকোয়

সময়টা উনবিংশ শতকের প্রায় মধ্যভাগ। বাংলার সমাজ, ধর্ম, সাহিত্য – সবেতেই যে নতুন জোয়ার আসছে, তার আঁচ পাওয়া শুরু হয়ে গেছে। কলকাতার বুকে উঠে আসছে একের পর এক ব্যক্তিত্ব। এর মাঝেই সবদিক জুড়ে রয়েছে একটি পিরালি ব্রাহ্মণ পরিবার। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথের সৌজন্যে তখনই বাংলার সমাজ সংস্কারের কাজে অন্যতম ভূমিকা নিয়েছিল এই পরিবার। সেখানেই উনবিংশ শতকের মাঝে জন্ম নিল একটি পুত্রসন্তান।

ওপরের অংশটুকু পড়ার পর পাঠকের মাথায় হয়ত ভর করবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। না, তা নয়। বঙ্গসমাজের এই অতিমানবের জন্মের ২১ বছর আগের কথা এটা। অবশ্য যার কথা হচ্ছে, তিনি সম্পর্কে রবি ঠাকুরের ‘বড়ো দাদা’। এক কথায় যিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। একইসঙ্গে নানা কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি ছিলেন অদ্ভুত রকমের উদাস, ছেলেমানুষ। ঠাকুর পরিবার তো বটেই, সেই সময় বাংলার অন্যতম প্রথম সারির গুণী বিদ্বজন হয়েও দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন খানিক পেছনে থাকা একজন; চালচিত্রের মতো…

ছোটো ভাই রবি’র সঙ্গে তাঁর বেশ মিল আছে। দুজনের কারোরই স্কুলের পড়াশোনা ভালো লাগত না। চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে আছে যে বিদ্যা, সেটাই তো অচলায়তন! স্রেফ পরীক্ষায় পাশ করতে হবে, এটাই কি একমাত্র চাওয়া? দ্বিজেন্দ্রনাথের মন চঞ্চল হয়ে উঠল। সেন্ট পল স্কুলে দু’বছর পড়াশোনা করলেনও; বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়েছিলেন। কলেজটা আর পার করলেন না। অবশ্য সেই সময় ঠাকুরবাড়ি নিজেই ছিল একটি প্রতিষ্ঠান। বাড়ির ওই লাইব্রেরির ভেতরেই মুক্তির স্বাদ পেতেন ছোট্ট দ্বিজেন্দ্রনাথ। দেবেন্দ্রনাথ-সারদাসুন্দরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র। ছোটো বয়স থেকে ওই লাইব্রেরি, আর সেখানকার বিভিন্ন বই-ই তাঁর উড়ে যাওয়ার ডানা ছিল। পাঁচ বছর বয়সে বিদ্যাশিক্ষা শুরু হওয়ার পর কয়েকদিনের মধ্যেই বাংলা থেকে সংস্কৃত মুগ্ধবোধে ঢোকা। অতঃপর, কুমারসম্ভবম, রঘুবংশম। ওই ছোটবেলাতেই এইসব শেষ করে ফেলেছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চার সীমা আরও বাড়তে থাকে তাঁর। সামান্য স্কুল কি এর হদিশ দিতে পারত?

হতে চেয়েছিলেন চিত্রশিল্পী। কিন্তু সে সুযোগ হয়নি। তবে তিনি যে দ্বিজেন্দ্রনাথ! কী না পারতেন! কবিতা, অনুবাদ, গান, বাদ্যযন্ত্র, ছবি, সম্পাদনা, দর্শনতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা, অঙ্ক— তালিকা করতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে। এরই মধ্যে অনুবাদক দ্বিজেন্দ্রনাথ একটু বিশেষ জায়গা নিয়ে আছেন। সেই যুবক বয়সেই সংস্কৃত অধ্যায়ন করে পণ্ডিত হয়ে উঠেছিলেন। আবার সেই সময় বিশ্বসাহিত্যও ধীরে ধীরে প্রবেশ করে বাংলায়। সব মিলিয়ে নিজস্ব চেতনা তৈরি হতে থাকে তাঁর। মাত্র ২০ বছর বয়সে হাতে তুলে নেন একটি গুরুদায়িত্ব। কবিতাচর্চা তো চলতই ঘরে। সেখান থেকেই আকর্ষণ জন্মায় কালিদাসের ‘মেঘদূতম’-এর প্রতি। ঠিক করেন, সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করবেন এই কাব্যগ্রন্থটি। করেনও। ১৮৬০ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনূদিত ‘মেঘদূত’। বাংলায় প্রথম কেউ এটিকে অনুবাদ করেন। এ-সম্পর্কে পরে স্মৃতিচারণ করেছিলেন তিনি—

“সিপাহী বিদ্রোহের কিছু পরে আমার ‘মেঘদূত’ প্রকাশিত হইল।… আমি যখন ‘মেঘদূত’ লিখি, তখন ও ধরণের বাঙ্গালা কবিতা কেহ লিখিতেন না; ঈশ্বর গুপ্তের ধরণটাই তখন প্রচলিত ছিল। মাইকেল তখন ইংরাজিতে কবিতা লিখিতেন। একদিন হাইকোর্টে আমার ভগ্নিপতি সারদাকে তিনি বলিলেন, ‘আমার ধারণা ছিল বাঙ্গালায় ভালো কবিতা রচিত হতে পারে না, ‘মেঘদূত’ পড়ে দেখছি আমার সে ধারণা ভুল।”

দ্বিজেন্দ্রনাথের পর আরও অনেকে এর শ্লোকের বঙ্গানুবাদ করেছেন। রবীন্দ্রনাথও করেছেন। কিন্তু শুরুটা করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথই। ঠিক যেমনভাবে গানের মধ্যে শুরু করেছিলেন স্বরলিপির প্রয়োগ। একইভাবে এসেছিল শর্টহ্যান্ডও। এই বিদ্যাটি বাংলায় শুরু করেছিলেন তিনিই। টানা ২৫ বছর সম্পাদনা করেন ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা। পরে ঠাকুরবাড়ির উদ্যোগে, বিশেষ করে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উৎসাহেই যখন প্রকাশ পায় ‘ভারতী’ পত্রিকা, তখন তাঁরও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হয়েছিলেন তিনি। ভারতী নামটিও তাঁরই দেওয়া। অবশ্য পরে দ্বিজেন্দ্রনাথ বলছেন, “জ্যোতির চেষ্টায় ‘ভারতী’ প্রকাশিত হইল।… আমি কিন্তু ওই নামটুকু দিয়াই খালাস। কাগজের সমস্ত ভার জ্যোতির ওপর পড়িল।” তাঁর রচিত ব্রাহ্মসঙ্গীত, কবিতা আর দর্শনতত্ত্ব বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ, তা বলাই বাহুল্য।

সব কিছু করতেন, এত কিছু জিনিস পারতেন; শুধু ছিল না একটিই জিনিস। সাংসারিক বুদ্ধি। সেই ব্যাপারে ছিল একরাশ উদাসীনতা। দেবেন্দ্রনাথ তাই বড়ো ছেলের ওপর কোনো দায়িত্বও চাপাননি। বিয়েও করেছিলেন, পাঁচ পুত্র দুই কন্যার পিতার দায়িত্বও পালন করেছেন। পরে স্ত্রী সর্বসুন্দরী দেবীর মৃত্যুর পর আর বিয়ে করেননি। বাবামশায় দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যতদিন ছিলেন, জোড়াসাঁকোই ছিল তাঁর আস্তানা। পরে চলে যান শান্তিনিকেতন। সেখানকার প্রকৃতির সান্নিধ্যেই যেন তাঁর সুখ, তাঁর শান্তি। সেখানকার হরেক রকম পাখি, কাঠবিড়ালিকে নিয়েই চলত আড্ডা। বহিরঙ্গে রাশভারী হলেও, ভেতরে ভেতরে ছিলেন অসম্ভব ছেলেমানুষ, আর অগোছালো। দ্বিজেন্দ্রনাথের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’ কাব্যগ্রন্থটি। রবীন্দ্রনাথও তাঁর বড়ো দাদার এই বইটির সম্পর্কে বলতে গিয়ে মুগ্ধতায় ভরিয়ে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে উল্লেখ করেছেন তাঁর ওই অগোছালো, উদাসীন স্বভাবটিরও— “স্বপ্নপ্রয়াণ কাব্যের ছেঁড়া পাণ্ডুলিপির পাতা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির যেখানে সেখানে পড়ে থাকত। এগুলি সংগ্রহ করে প্রকাশ করা গেলে তা উক্ত গ্রন্থের একটি মূল্যবান সংস্করণ হত।”

অবশ্য দ্বিজেন্দ্রনাথের এসবে কোনো হেলদোল নেই। আপনভোলা মানুষ ছিলেন তিনি। ঠাকুরবাড়ির অনেকের মতেই, ঋষিতুল্য ছিলেন তিনি। কারোর কিছু নিয়ে অভিযোগ ছিল না। নিজের সম্পর্কেও কিছু বলতে আলস্য লাগত তাঁর। শুধু একমনে বসে নিজের মতো ভাবনার জগতে ঘুরে বেড়াতেই ছিল তাঁর যত আনন্দ। ঠিক যেন ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’। ছোটো ভাই রবি যখন গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছেন, দ্বিজেন্দ্রনাথ বসে আছেন শান্তিনিকেতনের পবিত্র নিরালায়। ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি। ভাইয়ের নোবেল প্রাপ্তির খবর পেয়ে গেছেন অনেকদিন আগেই। কিন্তু কে যেন বারবার কড়া নেড়ে যাচ্ছে। নিজের গভীরে তাঁকে চিনতে পারলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। লিখলেন দুটি লাইন। সে এসেছে। ওইদিনই চিরকালের মতো ঘুমের দেশে চলে গিয়েছিলেন মানুষটি। আর লাইন দুটো?

“মাথায় করি লব যবে তুমি পাঠাইবে মরণ।
মরণ সে ডরে না কভু রহে যে ধরি চরণ।।”

ঋণ-
১) দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর মন ও শিল্প/ মৈত্রেয়ী মিত্র
২) দৈনিক ইত্তেফাক

Powered by Froala Editor

Latest News See More