দোলের সকাল, ভাঙের সরবত ও হেদুয়ার শিবাশ্রম – ‘রঙিন’ বাঙালির নেশার ঠিকানা

পৃথিবীটা মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই অত্যন্ত দ্রুত হয়ে উঠেছে। কর্মসূত্রে হোক অথবা নিছক অ্যাডভেঞ্চারের জন্য, মানুষ ক্রমাগত ছুটে বেড়াচ্ছেন এক দেশ থেকে অন্য দেশ। এর মধ্যে কোথাও শিকড় গাঁথার সময় কোথায়? বাস্তবিকই শিকড় ছিঁড়ে যাচ্ছে আমাদের। হারিয়ে যাচ্ছে শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানান উপকরণ। সেরকমই হারাতে বসেছে বাংলার নিজস্ব বেশ কিছু 'নেশা'। 'নেশা' শব্দটির সঙ্গে আমরা যেভাবে পরিচিত, ব্যাপারটা কিন্তু আদৌ সেরকম নয়। অনেকেই মনে করেন এইসব ভেষজ দ্রব্যের মধ্যে 'অ্যাডিকশন' তৈরি করার ক্ষমতা বিশেষ কিছু নেই।

আরও পড়ুন
বাংলার জামাই তিনি, ভোজনরসিক ও নেশায় ব্যোম – ‘ভুঁড়িওয়ালা’ শিবকে এভাবেই আপন করেছি আমরা

যেমন সিদ্ধির কথাই ধরা যাক। একগ্লাস দুধ; তার মধ্যে দই, সন্দেশ, বাদাম বাঁটা, কিশমিশ আর পরিমাণ মতো মিহি করে বাঁটা সিদ্ধি পাতা। এই নিয়ে সিদ্ধির সরবত। বাংলার একসময়ের জনপ্রিয় পানীয়ের তালিকায় প্রথম দিকেই থাকতো এই সিদ্ধির সরবত। শুধু নেশা করার জন্যই নয়, অতিথি আপ্যায়নের জন্যও এই পানীয়ের জনপ্রিয়তা ছিল প্রচুর। তবে সিদ্ধির সরবতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দোল উৎসব। উৎসবের আনন্দে নিজেদের হরেক রঙে রাঙিয়ে নিয়ে তারপর একগ্লাস সিদ্ধির সরবত। বাঙালির কাছে এর নিজস্ব একটি ডাকনাম আছে। ভাঙ। দোলের দিনের এই নেশাকে 'রাঙানেশা' বললে তাই অত্যুক্তি হয় না। আর প্রশাসনও তাই এদিনের জন্য আইন খানিকটা শিথিল করে।

আরও পড়ুন
নরকরোটি, হাড় ও মদ – বাঙালির ভূতচতুর্দশীর ছোঁয়া ‘ফুটবলের দেশ’ ব্রাজিলেও

দোলের দিন সিদ্ধির সরবতের জনপ্রিয়তা কিন্তু বাঙালির কাছে এখনও নেহাত কম নয়। প্রবাসী বাঙালিরাও অনেকে দেশে ফেরেন এই একটি দিন উৎসবের উষ্ণতা ভাগ করে নিতে। আর তার সঙ্গে তো অবশ্যই থাকতে হবে 'ভাঙের সরবত'। উত্তর কলকাতায় তো একটি জনপ্রিয় প্রবচন আছে, 'হেদুয়ায় লুটোপুটি'। এই হেদুয়া অঞ্চলটি রীতিমতো সিদ্ধির পীঠস্থান বলা যেতে পারে। প্রকাশ্য ও গোপন মিলিয়ে তো কম দোকান নেই এখানে। আর তার মধ্যে জনপ্রিয়তার নিরিখে বোধহয় সবার থেকে এগিয়ে থাকবে 'শিবাশ্রম'। বিধান সরণীর একদম উপরে বলেই হয়তো, দোলের দিন রীতিমতো লাইন পড়ে যায় এখানে। বছরের অন্যান্য দিন সরবত বিক্রি হয়। দোল, বিজয়া দশমী এবং শিবরাত্রি; এই তিনদিন সরবতের সঙ্গে মেশানো হয় সিদ্ধি পাতা। সেই ১৯৭৩ সাল থেকে এই ব্যবসা চলে আসছে। জানালেন দোকানের মালিক জয়ন্ত সাহা। তাঁর দুই প্রজন্মের ব্যবসা এখানে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন ছাড়াই কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে ওল্ড মঙ্ক

কথায় কথায় জানা গেল, রাজারহাট অঞ্চলের গ্রামগুলি থেকে সিদ্ধি পাতা সংগ্রহ করেন তিনি। চাষ এখন অনেক কমে গেছে। তবে এই কয়েকদিনের জন্য ব্যবসা ভালোই চলে। আর শিবাশ্রমে কেমন ভিড় হয়, সেকথা তো আগেই বলেছি। শুধুই সাধারণ মানুষ নয়। দোলের দিন এখানে ভিড় জমান টালিগঞ্জের তারকারাও। জয়ন্তবাবুর হাতে ভাঙ খেয়েছেন প্রসেনজিৎ, জিৎ, দেবের মতো তারকাও। তবে বাঙালির জীবনযাপনের সঙ্গে এই পানীয় আর বিশেষ জড়িয়ে নেই। উৎসবের দিন চিরাচরিত ঐতিহ্যের সঙ্গে একটু মিলেমিশে যাওয়া, এটুকুই। এর বেশি বোধহয় দরকারও নেই। অ্যালকোহলের মতো ক্ষতিকারক না হলেও, সিদ্ধির সরবতও শরীরের যথেষ্ট ক্ষতি করে বৈকি। তাই নিয়মিত সিদ্ধি সেবনের অভ্যাস ত্যাগ করাই ভালো। শুধু ইউরোপীয়দের অ্যালকোহল উপনিবেশে দাঁড়িয়েও আমরা যাতে নিজস্ব 'নেশা'র ঐতিহ্যকে মনে রাখতে পারি, এটুকুই যথেষ্ট।

More From Author See More

Latest News See More