ব্যারাকপুরে ৩০০০ আজাদ হিন্দ সৈন্য হত্যা, কেন ধামাচাপা দেওয়া হল সেই অধ্যায়?

অনেক রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ভারতের স্বাধীনতার লড়াই। জানা-অজানা কত বিপ্লবীদের সম্মিলিত প্রতিরোধের ফসল পেয়েছি আমরা! তবে সব গল্পই কি ইতিহাসের পাতায় উঠে এসেছে? এমন অনেক কাহিনিই আছে, যেগুলো আমাদের অগোচরে রয়ে গেছে। বলা ভালো, সামনে আসতে দেওয়া হয়নি। ব্রিটিশদের অত্যাচারের নৃশংস কিছু চিহ্নও চাপা পড়ে গেছে ইতিহাসের তলায়। নীলগঞ্জের নারকীয় হত্যালীলা এইরকমই একটি ভুলে যাওয়া অধ্যায়…

আসল বর্ণনায় আসার আগে একটু পাদপূরণ করা যাক। এই ঘটনা অবশ্য সবারই জানা। ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বও এর সঙ্গে জুড়ে আছেন। আইএনএ বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির প্রতিষ্ঠা। আরও ভালো করে বললে, আজাদ হিন্দ বাহিনীর সূচনা। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু’র নেতৃত্বে এই বাহিনী রীতিমতো ত্রাস তৈরি করেছিল ব্রিটিশদের ভেতর। শেষ পর্যন্ত নানা কারণে পরাজিত হতে হয় বটে; কিন্তু গোটা দেশবাসীর মধ্যে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেন তাঁরা। এরপরই বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে। লালকেল্লার ঐতিহাসিক বিচারসভা তো আছেই, সঙ্গে রয়েছে আরও দুটো রহস্য। প্রথমটি, নেতাজির অন্তর্ধান; যা আজও সমাধান হয়নি। আর অন্যটি, নীলগঞ্জের হত্যাকাণ্ড।

ব্যারাকপুরের কাছেই বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই নীলগঞ্জ। অনেক আগে থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আছে এই জায়গা। নামেও তার খানিক আভাস মেলে। হ্যাঁ, সেই নীল বিদ্রোহের সময় থেকেই এই অঞ্চল পরিচিত। পরে ব্যারাকপুর ব্রিটিশ সেনাদের আস্তানা হওয়ার পর এখানেও তার প্রভাব পড়ে। সালটা ১৯৪৫। ইতিমধ্যেই জাপানে পরমাণু বোমা পড়ে গেছে। আজাদ হিন্দ বাহিনী অর্থাৎ আইএনএ পরাজিত হয়েছে। সেই সেনাদেরই বন্দি করে রাখা হয়েছে নানা জায়গায়। আর ওই অবস্থাতেই চলত অত্যাচার। আইএনএ-র সেনাদের নানা গ্রুপে ভাগ করত ব্রিটিশ পুলিশ। ব্ল্যাক, গ্রে আর হোয়াইট। যাঁদের মধ্যে বেশি দেশাত্মবোধ, বেশি প্রতিরোধ করছে, তাঁদেরকে ব্ল্যাক ক্যাটাগরিতে রাখা হত। তারপর যারা ক্রমশ কম ‘বিপজ্জনক’, তাঁদের বাকি ক্যাটাগরিতে সুবিধা অনুযায়ী রাখা হত। আর অত্যাচারের মাত্রাও সেইভাবে ঠিক করা হত। ব্ল্যাক লিস্টে যারা ছিলেন, প্রবল নির্যাতন চলত তাঁদের ওপর। ওই অবস্থাতেই মারা যেতেন অনেকে। জিজ্ঞাস্য একটাই, সুভাষ বসু কোথায়?

আরও পড়ুন
স্বাধীন ভারতে ব্রাত্য আজাদ হিন্দ ফৌজ, অথচ তাদের গানই আজও ব্যবহৃত হয় সেনাবাহিনীতে

১৯৪৫ সালের সেই দিনটি ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর। মধ্যরাত পেরিয়েছে সবে। নীলগঞ্জের ডেরায় একটা খাঁচায় বন্দি প্রায় তিন হাজার আইএনএ বাহিনীর সৈন্য। একদিন ভারতকে স্বাধীন করার জন্য তাঁরা লড়েছিলেন। নেতা ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু স্বাধীনতার লক্ষ্য তো মিথ্যা হতে পারে না। হঠাৎ, ব্রিটিশ পুলিশ এসে হাজির। সঙ্গে কয়েকজন অফিসারও। এরপর কী হল, সেইটার বিস্তারিত বিবরণ আজ পাওয়া যায় না। শুধু সেই সময় আশেপাশের অঞ্চলে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা রাতদুপুরে শুনতে পান একটানা গুলির আওয়াজ। প্রায় গোটা রাত গুলি চলেছিল নীলগঞ্জের ওই ডেরায়। কাদের ওপর, সেটা আন্দাজ করে নিতে অসুবিধা হয় না। রাতারাতি আইএনএ’র ওই তিন হাজার সৈন্যকে ঠান্ডা করে ব্রিটিশ পুলিশ। কোল্ড-ব্লাডেড জেনোসাইড!

পরেরদিন যখন বাসিন্দারা ওখানে যান, সেখানকার দৃশ্য দেখে শিহরিত হন সবাই। পাশেই বয়ে যাচ্ছিল নোয়াই খাল। রং বদলে খালের জল হয়ে গেছে লাল! চারিদিকে ধোঁয়া; সঙ্গে পোড়া গন্ধ। মানুষ পোড়ার। এখানে সেখানে পড়ে আছে আইএনএ’র বন্দি সৈনিকদের ছিন্নভিন্ন দেহ। এক জায়গায় মাটি খোঁড়া হচ্ছে, সব দেহ একসঙ্গে সেখানে চাপা দেওয়া হবে। মিটিয়ে দেওয়া হবে এই নারকীয় ঘটনার সমস্ত নিদর্শন।

আরও পড়ুন
জাদু করে মঞ্চে ‘হাজির’ করতেন নিরুদ্দেশ নেতাজিকে, চোখ বেঁধে বাইক চালিয়েছেন কলকাতার রাস্তায়

এত বড়ো একটা ঘটনা, অথচ ইতিহাসে তার বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায় না। ১৯৪৫-এরই অক্টোবরে অমৃতবাজার পত্রিকায় এই ঘটনার বিবরণ হিসেবে বলা হয় ‘মাত্র পাঁচজন’ আইএনএ সৈন্য মারা গেছেন। তিন হাজারের জায়গায় পাঁচ! তার থেকেও বড়ো কথা, ভারত সরকারের তরফ থেকেও পরবর্তীতে এই ঘটনা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করা হয়নি। শুধু ওই জায়গায় ১৯৫৩ সালে সেনাদের স্মৃতিতে একটি পাট গবেষণা কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। কেন এরকম ধামাচাপা? আজাদ হিন্দ বাহিনী ভারতের ইতিহাসে একটি চিরস্মরণীয় নাম। তাঁদের একটা বড়ো অংশকে রাতদুপুরে স্রেফ ‘খুন’ করা হল। অথচ, আজকের ইতিহাস বই চুপ!

(ছবি - প্রতীকী)

আরও পড়ুন
আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনানী তিনি, স্বাধীনতার পর বেছে নিলেন টুরিস্ট গাইডের পেশা

Powered by Froala Editor

More From Author See More

Latest News See More