রাজপথে টহল জুলিয়াস সিজারের! ফরাসি বিপ্লবে অবাক-করা দৃশ্যের সাক্ষী ছিল ফ্রান্স

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের দোর্দণ্ডপ্রতাপ রোমান সেনাপতি জুলিয়াস সিজারের কাহিনি আমাদের সকলেরই জানা। বিশেষত উইলিয়াম শেকসপিয়ারের লেখা ট্র্যাজেডির সূত্র ধরেই আমরা চিনেছি নায়ক জুলিয়াসকে। তবে যদি বলা যায়, জুলিয়াস সিজার (Julius Caeser) অষ্টাদশ শতকেও ছোরা হাতে টহল দিয়েছেন ফ্রান্সের (France) রাস্তায়? 

অবাক লাগছে? না, কোনো গুজব নয়। ফরাসি বিপ্লবের সময়, ফ্রান্সের রাজপথ সাক্ষী ছিল এমনই এক দৃশ্যের। এমনকি জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে নিজেকে ফ্রান্সের সম্রাট হিসাবেও ঘোষণা করেন বৃদ্ধ জুলিয়াস সিজার। ব্যাপার কী? প্রায় আঠারোশো বছর পর তবে কি ফিরে এসেছিল রোমান নায়কের প্রেত? 

না, ব্যাপারটা তেমন নয়। ফ্রান্সের এই ‘জুলিয়াস সিজার’-এর আসল নাম জেমস ফ্রান্সিস জেভিয়ার হোয়াইট (James Francis Xavier Whyte)। সিজারের মতো তিনিও ছিলেন ফ্রান্সের সেনাপতি। কিন্তু কীভাবে জুলিয়াস সিজার হয়ে উঠেছিলেন তিনি? শুরু থেকেই বলা যাক সেই ঘটনা। 

ফ্রান্সের সেনাপতি হলেও, জেমস ফ্রান্সিসের জন্ম ১৭৩০ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে। উচ্চশিক্ষার জন্যই ফ্রান্সে পাড়ি দেন জেমস। ছোটো থেকেই অস্ত্রচালনায় বেশ পারদর্শী ছিলেন তিনি। ফলে, ফ্রান্সের সেনাবাহিনীতে সহজেই জায়গা করে নেন তরুণ আইরিস ব্যক্তি। ধীরে ধীরে বিস্তর সুনাম অর্জন করেন জেমস। হয় পদোন্নতিও। শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম সেনাপতি হয়ে ওঠেন তিনি। অবশ্য সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। 

ফ্রান্সে তখন রাজা ত্রয়োদশ লুই-এর শাসন। তবে দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা কার্ডিনাল রেচেলিউ। তাঁর অত্যাচারে রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে দেশের জনগণ। এমনকি সেনাবাহিনীর মধ্যেও ধীরে ধীরে রোষের উত্থান হয়। সেই সংবাদ গুপ্তচর মারফৎ পৌঁছেছিল কার্ডিনালের কাছেও। ফলে, সন্দেহজনক সমস্ত সেনা ও সেনাপতিদের তিনি বন্দি করেন প্যারিসের পূর্ব প্রাচীর সংলগ্ন বাস্তিলের দুর্গে। হ্যাঁ, এই দুর্গই ছিল সে-সময় রাজকীয় অত্যাচার, নিপীড়ন এবং শোষণের অন্যতম প্রতীক। 

সে যাই হোক, প্রসঙ্গে ফেরা যাক। জেমস ফ্রান্সিস জেভিয়ার কার্ডিনালের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন কিনা তার প্রমাণ নেই কোনো। তবে জাতিতে আইরিশ হওয়ায়, কার্ডিনাল-এর চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁকেও বন্দি হতে হয় বাস্তিলের দুর্গে। সেখানেই অন্ততপক্ষে ছ-বছর বন্দি ছিলেন জেমস ফ্রান্সিস। সেই-সময় থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে জেগে ওঠে জুলিয়াস সিজার-এর ‘আত্মা’। অন্তত পরবর্তীতে তেমনটাই দাবি করেছিলেন অনেকে। কারাগারে বন্দি অবস্থায় নাকি তিনি সমানে আউড়ে যেতেন, শেকসপিয়ার-রচিত ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকের প্রধান চরিত্রের সংলাপ। 

এরপর ১৭৮৯ সালের সেই ঐতিহাসিক দিন। ১৪ জুলাই। বুরবো রাজবংশের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ। কয়েক লক্ষ মানুষ জড়ো হন স্বৈরতন্ত্রের প্রতীক বাস্তিল দুর্গের চারদিকে। দুর্গের দরজা ভেঙেই অস্ত্রাগারে ঢুকে পড়েন বহু মানুষ। তারপর সশস্ত্র রক্ষীদের সঙ্গে সংঘাতের শেষে মুক্ত করে দেন সমস্ত বন্দিদের। ফ্রান্স তো বটেই গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে বাস্তিলের এই পতন এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। 

সেই-সময় অন্যান্য বন্দিদের সঙ্গে মুক্তি পেয়েছিলেন বাস্তিলের দুর্গে কারারুদ্ধ হয়ে থাকা ৭ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও। যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিল ৫৯ বছর বয়সি জেমস ফ্রান্সিস জেভিয়ার। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরেই হাতে তরবারি নিয়ে ফ্রান্সের রাস্তায় নামেন তিনি। তখন তার দাড়ির দৈর্ঘ্য হাত দুয়েক। পাঁচ বছরের কারাবাস ও অত্যাচারে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়েছেন তিনি। তবে দাপুটে সেনাপতির ব্যক্তিত্বে এতটুকুও ছাপ পড়েনি তার। হাতে তরবারি নিয়েই তিনি ঘোষণা করেন, তিনি জুলিয়াস সিজার। মুখেও ফুটেছিল শেকসপিয়রের নাটকের সেই অমোঘ সংলাপ, ‘ইফ ইউ মাস্ট ব্রেক দ্য ল, ডু ইট টু সিজ পাওয়ার’। 

জেমসের এই অভিব্যক্তি, সংলাপ রীতিমতো প্রভাবিতও করেছিল প্যারিসের রাস্তায় নামা, বিদ্রোহে অংশ নেওয়া মানুষদের। তবে সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই তাঁরা বুঝতে পারেন আদৌ আর প্রকৃতিস্থ নন তিনি। ফলে, বাধ্য হয়েই তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় চ্যারেন্টনের মানসিক হাসপাতালে। সেখানেই ১৭৯৫ সালে সেখান থেকে তাঁকে পাঠানো হয় পেটিট মেইসন-এ। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ছোট্ট সেলে এক-প্রকার বন্দি অবস্থাতেই দিন গুজরান করেন জেমস ফ্রান্সিস জেভিয়ার। তবে আমৃত্যু তাঁর বিশ্বাস ছিল, তিনিই জুলিয়াস সিজার, সেন্ট লুই কিংবা ঈশ্বর…

Powered by Froala Editor