গুণমুগ্ধ ছিলেন সত্যজিৎ-উত্তমের, অভিনয়ের তাগিদে শিখেছেন বাংলা ভাষাও

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছুটে চলেছে একটা টয় ট্রেন। আর তার পাশাপাশি দৌড়াচ্ছেন নেশাতুর অভিনেতা। হাতে ধরা মদের বোতল। টালমাটাল পায়ে চলতে চলতেই তিনি কথা বলছেন, ট্রেনের মধ্যে থাকা এক সহকর্মীর সঙ্গে। ছোট্ট শিশুর মতোই উচ্ছ্বাস তাঁর সর্বাঙ্গে। একটাই সিঙ্গেল শটে গোটা দৃশ্যটি ধরার পরেই লাফিয়ে উঠলেন পরিচালক তপন সিনহা। 

সেটা ষাটের দশকের শেষের দিক। দার্জিলিং-এ শুটিং চলছে ‘সাগিনা মাহাতো’-র। সে-কাহিনির মূল চরিত্রে অভিনেতা দিলীপকুমার। বলিউডি চলচ্চিত্রের জন্য জনপ্রিয়তা তো ছিলই, তবে ‘সাগিনা মাহাতো’-ই বাংলার ঘরের ছেলে করে তুলেছিল ট্র্যাজেডি কিং-কে। 

১৯৪২-৪৩ সালে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া শ্রমিক আন্দোলনের ছবিই প্রতিফলিত হয় ‘সাগিনা মাহাতো’-র আখ্যানে। ফলত, সিনেমার অধিকাংশই শুট হয়েছিল দার্জিলিং-এ। সে সূত্রেই দীর্ঘদিন দার্জিলিংযাপন দিলীপকুমারের। সঙ্গে ছিল স্ত্রী সায়রা বানুও। সে সময়ই স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে দিলীপকুমারের। শুধু যে তাঁর অভিনয় দেখতেই ভিড় জমত, তা নয়। আবদার মেটাতে হামেশাই তাঁকে হাজির হতে হত স্থানীয় স্কুল কিংবা আঞ্চলিক অনুষ্ঠানে। এমনকি স্থানীয় স্কুলের সংস্করণে আর্থিক সাহায্যও দিয়েছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা।

তবে বাংলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক চলচ্চিত্রজগতে পা দেওয়ার একেবারে শুরু থেকেই। বাঙালি পরিচালক অমিয় চক্রবর্তীর হাত ধরেই তাঁর প্রথম অভিনয় ‘জোয়ার-ভাটা’ সিনেমায়। খুব একটা না চললেও, সে সিনেমার দৌলতে পরিচালকের সঙ্গে বেশ সখ্য গড়ে উঠেছিল দিলীপকুমারের। বিমল রায় কিংবা হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকদের সঙ্গেও তাঁর আলাপ সেই সূত্রেই। সেই শুরুর দিন থেকেই ধীরে ধীরে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় তাঁর। শিখেছিলেন বাংলা ভাষাও। ‘দেবদাস’ সিনেমায় কাজ করেছেন বাঙালি আইকন সুচিত্রা সেনের সঙ্গেও। এমনকি, ‘দেবদাস’-এ অভিনয়ের পর থেকেই রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের গুণমুগ্ধ পাঠকও হয়ে উঠেছিলেন দিলীপ। কিন্তু বাংলা উচ্চারণে জড়তা ছিলই। সেই জড়তাও কেটে যায় দু’দশক পর।

সেটা ১৯৬৩ সাল। বাংলা চলচ্চিত্রে আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয় তাঁর। ‘পাড়ি’ সিনেমায়। আন্দামান সেলুলার জেলের জেলারের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল দিলীপকুমারকে। নায়ক ছিলেন ধর্মেন্দ্র। কিন্তু সামান্য পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্য দিলীপকুমার রপ্ত করেছিলেন বাংলা উচ্চারণ। বাংলা ঔপন্যাসিক নবেন্দু ঘোষের কাছে রীতিমতো পাঠ নিয়েছিলেন তিনি।

তবে ‘সাগিনা মাহাতো’-ই তাঁর শেষ অভিনীত বাংলা চলচ্চিত্র। কিন্তু তারপরেও বাংলার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়নি তাঁর। এই সিনেমার মুক্তির বছর চারেক পর দিলীপকুমারের অনুরোধেই এই ছবি হিন্দি রিমেক করেন তপন সিনহা। তবে বদলায়নি ছবির কাস্ট। আবদার করেন, সিনেমার সেটা গোটাটাই যেন অপরিবর্তিত থাকে। হয়েওছিল তেমনটাই।

এরপর আর বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় না করলেও, দর্শকের আসনে বার বার দেখা গেছে তাঁকে। নিয়মিত খবর রাখতেন বাংলা সিনেমার হাল-হাকিকতের ব্যাপারে। ‘ফুটপাথ’ এবং ‘মধুমতী’ ছবির প্রিমিয়ারে পাহাড়ী সান্যাল এবং ছবি বিশ্বাসকে তাঁর নমস্কার করার দৃশ্য রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছিল সেসময়। উত্তমকুমারকে অভিহিত করেছিলেন ‘তৎকালীন প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা’ হিসাবে। আর মহানায়ক? ‘ইউসুফদা’-র উচ্চারণ থেকে শুরু করে তাঁর অভিনয়ের ধরণ সবটাকেই প্রামাণ্য মানতেন তিনি। পরবর্তীতে সত্যজিতের পরিচালনায় অভিনয় করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন দিলীপকুমার, কিন্তু সে সুযোগ মেলেনি আর। 

কিংবদন্তির প্রয়াণের পর আজ বারবার উঠে আসছে ‘অভিনেতা’ দিলীপকুমার কথা। কিন্তু এর আড়ালে অনালোচিত থেকে গেছে আরও এক প্রত্যাবর্তনের কাহিনি। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় সেটা। মুম্বাই ছেড়ে বাংলায় এসেছিলেন দিলীপকুমার। সেবার অবশ্য কোনো সিনেমার জন্য নয়। এসেছিলেন ক্রিকেটের সৌজন্যে। বলিউডের সঙ্গে টলিপাড়ার অভিনেতাদের একটি চ্যারিটি ম্যাচ আয়োজিত হয়েছিল কলকাতার ইডেনে। বলিউডি দলের অধিনায়ক হিসাবেই তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেদিন। জিতেওছিলেন সে-ম্যাচ। বিপক্ষে ছিলেন সৌমিত্র, উত্তমকুমারের মতো তারকারা। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেদিন বাঙালির সমর্থন থেকে এতটুকু বঞ্চিত হননি তিনি। আজও কি বাংলার বুকে এতটুকু কমেছে তাঁর জনপ্রিয়তা কিংবা গ্রহণযোগ্যতা? বোধ হয় না। গোটা বাংলা চলচ্চিত্রমহলের শোকস্তব্ধতাই তার প্রমাণ…

তথ্যসূত্রঃ

১. গৌর+তপন+ইউসুফ = সাগিনা, পথিক গুহ, আনন্দবাজার

২. Dilip Kumar leapt like a child on seeing the toy train!, Times Of India

৩. When Dilip Kumar impressed in Bengali cinema, The Hindu

৪. Rare Clip of Raj Kapoor & Dilip Kumar Playing Cricket For Drought Relief, Neeti Vijaykumar, The Better India

৫. Remembering Uttam Kumar: 10 memorable quotes about the ‘Mahanayak’ of Bengali cinema, Times Of India

Powered by Froala Editor

More From Author See More