তিন-তিনটি দেশে গুপ্তচরবৃত্তি, ডাসকো পোপভের অনুকরণেই জন্ম 'জেমস বন্ড'-এর!

ডেভিড নিভেন, রজার মুর, ড্যানিয়েল ক্রেগ, শন কোনারি, পিয়ার্স ব্রসনান— এই অভিনেতাদের মধ্যে মিল কোথায়? প্রশ্নটার উত্তর দিতে বেশি দেরি করবেন না সিনেপ্রেমীরা। হ্যাঁ, জেমস বন্ড। কালো স্যুট, সুদর্শন, সাহসী এক ব্রিটিশ স্পাই; উদ্দাম যৌবন, নারীসঙ্গ— আর তার সঙ্গে একের পর এক অভিযান। ‘০০৭’-এর এমন রূপের সঙ্গে আমাদের আলাপ বহুদিনের। ইয়ান ফ্লেমিংয়ের তৈরি করা এই চরিত্র শুধু বড়পর্দায় নয়, গল্পের পাতাতেও সমানভাবে জনপ্রিয়। বন্ডের নিত্যনতুন গ্যাজেট, বরফশীতল মস্তিস্ক আর অ্যাকশন আর বন্ড গার্লদের আকর্ষণই আলাদা। কিন্তু সব চরিত্রই কি কাল্পনিক? সত্যিই কি বাস্তব জীবনে এরকম কাউকে দেখেছিলেন ইয়ান ফ্লেমিং?

জেমস বন্ডের বাস্তব অস্তিত্ব সন্ধান করতে গিয়ে নানা মানুষের নাম সামনে এসেছে। আর সেই নামের মধ্যেই উজ্জ্বলতম হলেন ডাসকো পোপভ। পর্দার বন্ডের মতো ইনিও ছিলেন একজন স্পাই; আরও ভালো করে বললে ট্রিপল স্পাই। একসঙ্গে তিনটে দেশের গুপ্তচরবৃত্তি করতেন তিনি। মূলত কাজ করতেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫ এবং এমআই৬-এর হয়ে। আর জার্মান নাৎসিদের হয়েও কাজ করেছেন; তবে সেখানে পোপভের কাজটি ছিল ভুল তথ্য সরবরাহ করা আর ভেতরের খবর নিয়ে আসা। এই সার্বিয়ান গোয়েন্দাই ছিলেন ‘জেমস বন্ড’ তৈরির অন্যতম প্রধান চালচিত্র। পোপভের জীবনযাত্রা, নারীসঙ্গ এবং গোয়েন্দার চরিত্রটিকেই বইয়ে এবং পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন ইয়ান ফ্লেমিং। 

গল্পের পটভূমিকা শুরু হয় পর্তুগাল থেকে। সেখানেই আছে ক্যাসিনো এসটোরিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক গোয়েন্দার গোপন আড্ডাস্থল ছিল এই জায়গাটি। ক্যাসিনো খেলতে খেলতে মাথার ধার বাড়ত, সঙ্গে চলত গোপন পরামর্শ, তৈরি হত অভিযানের ব্লুপ্রিন্ট। এখানেই ১৯৪১ সালে প্রথমবার মুখোমুখি আলাপ হয় ডাসকো পোপভ এবং ইয়ান ফ্লেমিংয়ের। ফ্লেমিং দেখেন, ক্যাসিনোর ভেতর খেলায় ব্যস্ত পোপভ। রীতিমতো দক্ষ চালে মাত করছেন বিপক্ষকে। চোখের কোণে খেলে যাচ্ছে বুদ্ধির ধার। এরপর দুজনের মধ্যে আলাপ হয়, কথাবার্তাও হয়। তবে ইয়ান ফ্লেমিংয়ের মাথায় খেলা করছে পোপভের সেই তীক্ষ্ণ চেহারা। একটু একটু করে তৈরি হচ্ছে একটা চরিত্র। পর্তুগালের এই ক্যাসিনো থেকেই প্রকৃতপক্ষে যাত্রা শুরু ‘জেমস বন্ড’-এর। ফ্লেমিংও প্রথমবার বন্ডকে নিয়ে আসেন ক্যাসিনোর খেলার মাধ্যমেই। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’, বন্ডের প্রথম গল্প। কোথা থেকে অনুপ্রেরণা পেলেন, সেটা আর বলে দিতে হয় না। 

ডাসকো পোপভের জীবনযাত্রার দিকে তাকালে বোঝা যাবে, বন্ডের চরিত্রের সঙ্গে কতটা যুক্ত তিনি। জুয়াড়ি, গোয়েন্দার পাশাপাশি বাকি জীবনও ছিল বর্ণময়। নারীসঙ্গ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখতেন না পোপভ। সার্বিয়ার বিত্তশালী পরিবারের ছেলে, ছোটো থেকেই ধনদৌলতের মধ্যে বেড়ে ওঠা। কলেজে আইন নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর বেলগ্রেডের প্রায় সবকটা নাইটক্লাব, পাবে যাতায়াত ছিল তাঁর। মেয়েরা সহজেই তাঁর দিকে আকৃষ্ট হত; আর তিনিও উপভোগ করতেন সেসব। গোয়েন্দা হয়ে যাবার পরও যা ছিল পোপভের মজ্জায় মজ্জায়। এমনকি সেই সময়ের এক অভিনেত্রী, সিমোনে সিমোনের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল বলে শোনা যায়। এবার ফিরে তাকানো যাক জেমস বন্ডের দিকে। মিল পাচ্ছেন? বন্ড গার্লদের আবির্ভাব আর তাঁদের জাঁকজমকই বলে দেয় বাকি কথা। পোপভের জীবনকে যে গভীরভাবে লক্ষ্য করেছিলেন ফ্লেমিং, তা বোঝাই যায়। 

প্রথমে জার্মান নাৎজির গোয়েন্দা বাহিনিতে ভর্তি হলেও ইংল্যান্ডে গিয়ে নিজের মত বদলে নেন পোপভ। তারপর এমআই৬ আর এমআই৫-এর হয়ে ডাবল এজেন্টের কাজ করতেন। যুগোস্লাভিয়ার হয়েও স্পাইগিরি করেছেন। পার্ল হারবারে হামলার ব্যাপারেও আগাম অনুমান করেছিলেন পোপভ। কিন্তু সেটা প্রথমে গ্রাহ্য করেনি ইন্টেলিজেন্স। যদি করত তাহলে হয়ত ইতিহাসের অনেক কিছুই ঘটত না। এদিকে ফ্লেমিং নিজেও ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স অফিসার। কাজেই মনস্তত্ত্ব কোথাও গিয়ে মিলে যায়। পোপভের বর্ণময় জীবন, তাঁর নারীসঙ্গ উদযাপনকেই তুলে আনলেন বইয়ের পাতায়। সবথেকে অদ্ভুত কথা, পর্তুগালের সেই ক্যাসিনো এসটোরিল আর সেখানকার হোটেলে জেমস বন্ডের একটি সিনেমার শুটিংও হয়েছিল। 

যদি একটু ভালো করে দেখা যায়, তাহলে ডাসকো পোপভের চেহারার সঙ্গেও জেমস বন্ডের মিল পাওয়া যাবে। তবে একটি ব্যাপারে অমিল আছে এই দুজনের। বন্ডের মতো মাদকাসক্ত ছিলেন না পোপভ। এটুকু বাদ দিলে বাকিটা শুধু মিল আর মিল। এই মিল নিয়েই মিথ হয়েছেন জেমস বন্ড। তার হাত ধরে ডাসকো পোপভও…

তথ্যসূত্র-
'The playboy Serbian spy who inspired James Bond', BBC

Powered by Froala Editor

More From Author See More

Latest News See More