অজস্র বিতর্ক নিয়েও ‘মিম’ এখন অনলাইন সংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গ

বাংলা সংস্কৃতিতে 'মিম কালচার' এগিয়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। যে কোনও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে মজাদার ‘মিম’ ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের গ্রুপগুলোতে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে মেসির দুর্দান্ত গোল কিংবা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর বান্ধবী রিয়া চক্রবর্তীর দিকে আঙ্গুল ওঠায় তার ক্ষমা চাওয়ার ভিডিয়ো, মিমের বিষয় সর্বত্রগামী। সাম্প্রতিক করোনা মহামারীর ছোঁয়ায় অবসাদগ্রস্ত প্রজন্মের কাছে মিম এখন এক ঝলক হাসি-ঠাট্টার মুক্তাঙ্গন।

করোনা মহামারীর করাল গ্রাস থেকে রেহাই পেতে দেশজুড়ে জারি হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী লকডাউন প্রক্রিয়া। ধীরে ধীরে সেই লকডাউন পর্ব পেরিয়ে আনলক পর্যায়ে এগিয়ে চলেছে সারা বিশ্বই। কোভিড পরবর্তী এই সময়কে 'নিও নর্মাল' বলে অভিহিত করা হচ্ছে অনেক জায়গাতেই। এই নিও নর্মাল পরিস্থিতি কেমন হতে চলেছে, সেই ছবিও ধরা পড়ছে অনেক ক্ষেত্রেই এই সমস্ত মিমের মাধ্যমে।

সব ধরণের বয়সের মানুষের কাছেই কমিক্সের গ্রহণযোগ্যতা এখনও প্রশ্নাতীত। সেই সকল কমিক্সের মজাই আরও অন্যভাবে বয়ে নিয়ে চলেছে সাম্প্রতিক মিম সংস্কৃতি। বহু আলোচিত এবং বিখ্যাত কমিক্স চরিত্রদের মুখে সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত বিষয়ের মন্তব্য যোগ করেই তৈরি হচ্ছে এই মিমগুলি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রশংসাও কুড়োচ্ছে সেগুলো।

কোভিড কতখানি বদলে দিয়েছে পৃথিবীকে, সেই বিষয়ে কমিক্সের মাধ্যমে আলোকপাত করেছে এমিলি স্টেইনবার্গের 'রিং দ্য বেলস'। অবসাদের হাতছানি পেরিয়ে উঠে এসেছে আলোর ঝলক। কোভিড পরবর্তী পৃথিবী আরও সবুজ এবং বসবাসের জন্য ভালো জায়গা হয়ে উঠেছে, কমিক্সের চরিত্রদের মুখের সংলাপ যেন নির্দেশ করেছে সেই দিকেই: "আমরা কি রিবুট করতে পারি?" "আমরা কি স্মার্ট হতে পারি?"

যে কোনও জটিল সমসাময়িক বিষয়কে সহজে মজাদার রূপায়ণের মাধ্যমে উপস্থাপন করে বলেই এই সমস্ত কমিকস বা মিমের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে ব্যাপকভাবে, একথা বলাই বাহুল্য। নীরস সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং মজার মোড়কে বর্ণময় এবং জোরালো মেসেজ বহন করছে বলেই এই সমস্ত টুকরো টুকরো মিমগুলি অনায়াসেই আকর্ষণ করে চলেছে মনোযোগ। তবে এই প্রথমবার নয়, ১৯১৮-১৯ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর সময়েও বাড ফিশারের ‘মাট অ্যান্ড জেফ’ এবং এডুইনা ডামের ‘ক্যাপ স্টাবস অ্যান্ড ট্রিপি’র মতো কমিকস তুলে ধরেছিল সমসাময়িক সমস্যাকে।

তবে শুধুমাত্র মজার উপকরণ হিসেবে দেখলে নিতান্তই ভুল হবে এই সমস্ত মিম বা কমিক্সের উপকরণগুলিকে। সরকারের প্রতিষ্ঠানগত ভুল অথবা নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের দিকে আঙুল তোলার জন্যেও রীতিমতো জোরালো হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এগুলি।  কিন্তু কখনো কখনো কি সৌজন্যবোধও ছাড়িয়ে যাচ্ছে না এই সমস্ত মিমগুলির বক্তব্য? সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর জন্য রিয়া চক্রবর্তী কতখানি দায়ী, সেটি এখনও আইনের বিচারাধীন বিষয়। তবুও যেভাবে প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়ায় মিমের মাধ্যমে তোপ দাগা হচ্ছে তার দিকে, তাতে আদতে কতখানি সৌজন্য বা ভদ্রতাবোধ থাকছে তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়। শুধু তাই নয়, চোরা একটি জাতিবিদ্বেষও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এইসব মিমের মাধ্যমে। রিয়া চক্রবর্তী এবং সাড়া জাগানো সিনেমা ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর একটি বিশেষ দৃশ্যের ছবি পাশাপাশি রেখে লিখে দেওয়া হচ্ছে কীভাবে বাঙালি মহিলারা সব সময় বিহারি যুবকদের ক্ষতি করে এসেছে! এই প্রবণতা মারাত্মক। এমনকি ধ্বংসাত্মক বললেও কম বলা হয়।

তাই ধীরে ধীরে নিছক এই মজার উপকরণটি কোথাও যেন ট্রোলিং সংস্কৃতিকেও তোল্লাই দিচ্ছে একনাগাড়ে। বেশি দিন আগের কথা নয়, ২০১৯-এ মেট গালার রেড কার্পেটে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার পোশাক নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল একের পর এক কুৎসিত মিম। বর্তমানে রাজনীতিবিদ থেকে ক্রীড়া জগতের প্রতিনিধি কিংবা চলচ্চিত্র তারকারা কেউই রেহাই পাচ্ছেন না এই মিমের হাত থেকে। একথা অবশ্যই সঠিক যে সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেকেরই নিজস্ব মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা যখন অন্যের চরিত্রে দাগ ফেলে অনৈতিক ভাবে, বিখ্যাত মানুষদের ও পরিবার-পরিজনের কথা বিন্দুমাত্র মাথায় না রেখে তাদের নিয়ে অশ্লীল মিম বানানো হয়, তখন আপত্তির জায়গাটা ওঠেই বইকি! এই সংস্কৃতি যেন চাপা হীনমন্যতাবোধের প্রকাশও হয়ে দাঁড়ায় কোথাও কোথাও।

যদিও তার পরেও যে কোনো শিল্পের মতোই মিমের ভাল দিকটির দিকেই যদি তাকানো যায়, তাহলে আমরা দেখতে পাব কীভাবে এই করোনা পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের সম্মান দিয়ে তৈরি হয়েছে একের পর এক মিম। এক্ষেত্রে করোনাভাইরাসকে শক্তিশালী ভিলেন হিসেবে দেখিয়ে চিকিৎসকদের দেখানো হয়েছে জনপ্রিয় অ্যাভেঞ্জার্স চরিত্রদের রূপে। তাই একথা মেনে নিতে অসুবিধা নেই, যে কোনও জিনিসেরই খারাপ ভালো-খারাপ বা সাদা-কালো থাকার মতোই, এই কমিক্স বা মিম সংস্কৃতিরও দুটো দিকই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে এখন। তার কোনটা আমরা গ্রহণ করব আর কোনটা ছেড়ে দেওয়া উচিত, সেটা যত তাড়াতাড়ি বোধগম্য হয় ততই মানসিকভাবেও আরও একটু সুস্থতা লাভের পথে এগোতে পারি আমরা।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Powered by Froala Editor

More From Author See More