বিলুপ্তপ্রায় ‘সিদ্দি’ কাঁথাকে বাঁচিয়ে তোলার উদ্যোগ ভারতীয় ইতিহাসবিদের

একুশ শতকের শুরুর দিক সেটা। কর্মসূত্রে কর্ণাটকের শিমোগা জেলার নিনাসাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটে হাজির হয়েছিলেন শিল্পী, ইতিহাসবিদ ও গবেষক অনিতা এন রেড্ডি। তবে সারাক্ষণ তো আর ঘরে বসে থাকা যায় না। কাজের ফাঁকে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন বন্ধুর স্ত্রী-এর সঙ্গে। ঘুরে দেখছিলেন গ্রামীণ অঞ্চলগুলি। আর সে-সময়ই তাঁর নজর কাড়ে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের এবং তাঁদের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বুনন শিল্প। 

‘সিদ্দি কুইল্ট’ বা ‘সিদ্দি কাঁথা’ (Siddi Quilts)। অবশ্য স্থানীয়দের কাছে এটা কোনো শিল্প নয়। দৈনিক যাপনের একটি অঙ্গ মাত্র। তবে সময়ের আবহেই হারিয়ে যেতে বসেছিল এই ঐতিহ্যবাহী কাঁথা স্টিচ। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অনীতা বিলুপ্তপ্রায় এই শিল্পকেই বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অনিতা। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, সিদ্দি মহিলাদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার। প্রশ্ন থেকে যায়, এই সিদ্দিরা কারা?

আসলে প্রাচীন এই সম্প্রদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। মূলত কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, গোয়া ও গুজরাটের কিছু অংশে বসবাস সিদ্দিদের। ২০১১ সালের সেনসার অনুযায়ী, ভারতে সিদ্দিদের জনসংখ্যা মাত্র ২৫ হাজার। তবে ভারতীয় হলেও এই উপমহাদেশে জন্ম হয়নি এই সম্প্রদায়ের।  বরং, সিদ্দিদের শিকড় ছড়িয়ে আফ্রিকায়। জাতিগত দিক থেকে তাঁরা বান্টু উপজাতির মানুষ। আবার কেউ কেউ ইথিওপিয়ান। পর্তুগিজ এবং আরবের বণিক ও নাবিকরা একসময় ক্রীতদাস হিসাবে তাঁদের নিয়ে এসেছিল এ-দেশে। তারপর সময় গড়িয়েছে। গঙ্গার বুক দিয়ে বয়ে গেছে বহু জল। অবসান হয়েছে দাসত্বের। স্বাধীনতার পর তাঁরাও স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে উঠেছেন এই দেশের। কেউ গ্রহণ করেছেন হিন্দুধর্ম, কেউ আবার মুসলমান বা খ্রিস্টান। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, আজও তাঁদের নিজস্ব কোনো জমি নেই। 

সে যাই হোক, আপাতত সিদ্দিদের ইতিহাস কথা সরিয়ে রেখে ফিরে যাওয়া যাক তাঁদের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্পে। প্রাচীনকাল থেকেই ভূস্বামীদের ফেলে দেওয়া পুরনো পোশাক, কাপড়, টেবিল ক্লথ সেলাই করেই বিশেষ ধরনের কাঁথা তৈরি করেন সিদ্দি মহিলারা। যদিও ভারতীয় কাঁথা স্টিচের থেকে এই কাঁথার বুনন বেশ আলাদা। মূলত ত্রিকোণাকার কাপড়ের টুকরো সেলাই করেই এই কাঁথা বানান তাঁরা। তার ওপর এলোমেলোভাবে বসানো হয় রঙবাহারি কাপড়ের ছোটো ছোটো টুকরো। সবমিলিয়ে ব্যাপারটা যে দৃষ্টিনন্দন, তাতে সন্দেহ নেই কোনো। 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পই হারিয়ে যেতে বসেছিল ধীরে ধীরে। তার কারণ, কাঁথা বুননে তরুণ প্রজন্মের অনীহা। বর্তমানে বাজারজাত কম্বল এবং লেপের ওপর নির্ভরতা তৈরি হওয়ায় কাঁথা বোনার প্রবণতা প্রায় উঠেই গেছে সিদ্দিদের মধ্যে। পাশাপাশি কাঁথা বুনন তাঁদের সমাজে কোনো শিল্প বলে পরিচিতিও পায়নি কোনোদিন। ফলে, তাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো বাড়তি উদ্যোগও ছিল না স্বাভাবিকভাবেই। 

সিদ্দিদের এই প্রাচীন কাঁথা স্টিচের ওপরেই একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন অনিতা। তাঁর তোলা ছবি ও লেখালিখির দৌলতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে আসে সিদ্দিদের এই শিল্প। পরবর্তীতে সিদ্দি মহিলাদের নিয়ে অনিতা গড়ে তোলেন ছোটো ছোটো দল। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে হাতিয়ার করেই তাঁদের শিল্প পৌঁছে দেন সাধারণ মানুষের কাছে। বর্তমানে দক্ষিণ ভারতে বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছে সিদ্দিদের এই কাঁথা। অন্যান্য কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে ঘরে বসে আয়েরও পথ দেখছেন সিদ্দি মহিলারা। হয়ে উঠছেন স্বনির্ভর। বর্তমানে শুধু কাঁথা বুনেই মাসে তাঁদের আয় ৮-১০ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে অনিতার এই উদ্যোগ এক প্রাচীন শিল্প ও তার ইতিহাস সংরক্ষণই নয়, বরং পিছিয়ে পড়া এক জনজাতির ক্ষমতায়নেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে বর্তমানে…

Powered by Froala Editor