ব্যর্থ দাম্পত্য তাঁকে দিয়েছে অবসাদ, ৩৯ বছরেই থেমেছিলেন বলিউডের ‘ট্র্যাজিক হিরোইন’

ক্যামেরার জৌলুসময় জগতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের মনোরঞ্জন করাই তো অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কাজ। কিন্তু তার আড়ালে যে থেকে যায় অনেক না জানা কথা। অনেক অদেখা চোখের জল। আর সেসবের মধ্যেই বেঁচে থাকে একেকটি জীবন। ঠিক তেমনই একটি জীবনের নাম মীনা কুমারী। প্রায় তিন দশক ধরে হিন্দি সিনেমার জগত মাতিয়ে রেখেও নিজের জীবনে সহ্য করেছেন একের পর এক নির্যাতন। সেসব ঘটনার সাক্ষী অবশ্য রেখেছে সেকালের ফিল্ম ম্যাগাজিন।

বলিউডের জগতে তিনি পরিচিত ‘ট্র্যাজিক হিরোইন’ নামে। সিনেমার চরিত্রদের দুঃখ-কষ্টের ছবি যেন অদ্ভুত মমতায় ফুটিয়ে তুলতেন মীনা কুমারী। তার সঙ্গে কি মিশে থাকত না তাঁর নিজের জীবনের অনেক যন্ত্রণাও? হয়তো মনে পড়ে যেত শৈশবের সেই দারিদ্র্যের দিনগুলি। ১৯৩৯ সালে বিজয় ভট্টের ‘লেদারফেস’ সিনেমায় প্রথম আত্মপ্রকাশ মীনা কুমারীর। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৬ বছর। সেই বয়সেই রোজগারের জন্য পথে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। আর সেই সূত্রেই চলে এলেন বলিউডের আঙিনায়।

এরপর ‘আধুরি কাহানি’, ‘পূজা’, ‘এক হি ভুল’ একের পর এক সিনেমায় শিশু অভিনেত্রী দর্শকদের মন জয় করতে থাকেন। সামান্য রোজগারের মুখও দেখতে শুরু করেন। কিন্তু তার পরেও বাবা মাস্টার আলিবক্সের চাহিদা মেটাতে পারেন না তিনি। আর তাই চলতে থাকে নির্যাতন। এর মধ্যেই পরিচয় হয় লেখক কমল আমরোহির সঙ্গে। প্রথমে দুজনের সম্পর্ক এগিয়েছিল স্বাভাবিক ছন্দেই। কিন্তু পরিবার থেকে চাপ দেওয়া হয় দুজনের বিবাহের জন্য। মীনা কুমারীর অবশ্য তাতে আপত্তি ছিল না। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ভুল বুঝতে পারলেন তিনি। সারা জীবন যে নির্যাতন তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে, বিবাহের পরেও তার থেকে মুক্তি নেই। কমলের আরও তিন স্ত্রীর তুলনায় তাঁর উপরে নির্যাতনের মাত্রাটা ছিল খানিকটা বেশি। মীনা দীর্ঘদিন সেই অত্যাচার সহ্য করলেও শেষ পর্যন্ত কমল নিজেই বিচ্ছেদ চাইলেন। ১৯৬৪ সালে বিচ্ছেদ হল দুজনের। আর তারপরেই চূড়ান্ত অবসাদ গ্রাস করল মীনা কুমারীকে। মাদকের নেশায় ডুবিয়ে দিতে চাইলেন নিজেকে।

কিন্তু বিচ্ছেদের কিছুদিনের মধ্যেই কমল আবার মীনার সঙ্গে সম্পর্কে ফিরতে চাইলেন। মীনাও অবশ্য ততদিনে তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কিন্তু এখানে বাধ সাধল ইসলাম ধর্ম। প্রথা অনুযায়ী বিচ্ছেদের পর আবার সম্পর্কে ফিরতে হলে মেয়েকে হালাল হতে হবে। আর অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের পরেই সেটা সম্ভব। কমল তাঁর পরিচিত আমানুল্লাহ খানকে বেছে নিলেন এই কাজের জন্য। এই শেষ ধাক্কাটা আর সহ্য করতে পারেননি মীনা কুমারী। তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা আর দেহব্যবসার মধ্যে আদৌ কি কোনো পার্থক্য আছে?

কমল আর মীনার পুনর্মিলন আর কোনোদিন সম্ভব হয়নি। একাকিত্বের মধ্যেই ক্রমশ লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন মীনা। আর তখনই আসেন হিন্দি সিনেমার আরেক জনপ্রিয় নায়ক, ধর্মেন্দ্র। মীনা কুমারী আর ধর্মেন্দ্রর সম্পর্ক নিয়ে অনেক গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল। হয়তো মীনা চেয়েছিলেন কেউ তাঁর সঙ্গে কষ্ট ভাগ করে নিক। কিন্তু সেই সম্পর্কও কোনো পরিণতি পায়নি। মীনা কুমারী জানিয়েছিলেন, ধর্মেন্দ্র শুধু সিনেমার মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যবহার করেছিলেন মীনা কুমারীকে। তার মধ্যে ভালোবাসা ছিল না কোথাও।

তবে এর মধ্যেও একজন বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছিলেন মীনা কুমারী। তিনি কবি, গীতিকার গুলজার। এই বন্ধুত্ব কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত টিকে ছিল। ১৯৭২ সালের ৩১ মার্চ মৃত্যুর আগে গুলজারকে একটি ডাইরি দিয়ে গিয়েছিলেন মীনা কুমারী। আর তাতে লেখা ছিল অসংখ্য কবিতা। কোনোটা মীনা কুমারীর লেখা। কোনোটা আবার তাঁর প্রিয় কোনো অবিতা। মন খারাপ থাকলে সেইসব কবিতা পড়তেন তিনি। অবশ্য সে কথা জানতেন শুধু গুলজার। জীবনের শেষে আরেকজনকে পাশে পেয়েছিলেন তিনি। সিনেমার উঠতি অভিনেত্রী মমতাজ বেগম। মীনা কুমারীর সিনেমাতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। কিন্তু তখন তাঁকে যথেষ্ট পারিশ্রমিক দিতে পারেননি। সেটা কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে কোনো অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। তবে জীবনের শেষে ঋণ শোধ করে গিয়েছিলেন মীনা কুমারী। তাঁর বাংলোটি দিয়ে গিয়েছিলেন মমতাজকে।

ছোটো থেকেই অত্যাচার সহ্য করে গিয়েছেন মীনা কুমারী। অথচ তার মধ্যেই দিয়ে গিয়েছেন কাজল, পাকিজাহ, বিজু বাওরার মতো জনপ্রিয় সিনেমা। সেইসঙ্গে অসংখ্য ধর্মীয় ধারাবাহিকে দেবী চরিত্রে অভিনয় করে মানুষের মন জয় করেছেন। কিন্তু এইসব জৌলুসের মধ্যেও নায়িকাকে দেখা যেত সাদা পোশাকে। রঙিন জগতে থেকেও তাঁর জীবন যে আসলে সাদা-কালো।

Powered by Froala Editor

More From Author See More

Latest News See More

avcılar escortgaziantep escortesenyurt escortantep escortbahçeşehir escort